পুলিশের গুলি কেড়ে নেয় আস-সাবুরের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন

মোহাম্মদ আককাস আলী প্রতিনিধি নওগাঁ মহাদেবপুরঃ পুলিশের গুলি কেড়ে নেয় আস-সাবুরের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন, বেঁচে থাকলে তাদের পরিবারেও আজ আনন্দের বন্যা বইতো বলে আক্ষেপ করেন জুলাই অভূত্থানে শহিদ আস-সাবুরের মা।
ভালো ফলাফল অর্জন করে সবচেয়ে বেশী খুশি হতো যে সে তো আর নেই, পরীক্ষা দেয়াও হয়নি। তাঁকে ছাড়াই প্রায় ১ বছর তার স্মৃতিগুলো আঁকড়ে বেঁচে থাকা আস-সাবুরের মা রাহেন জান্নাত ফেরদৌসী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, বাবার মতো সৎ মানুষ হিসেবে বাঁচতে পড়াশোনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতো সে।
বাবার গার্মেন্টেসে চাকুরির সুবাদে ছোট থেকেই স্ব-পরিবারে ঢাকার আশুলিয়া জামগড়া বাজারে বসবাস করতেন তারা। আস-সাবুর মহাদেবপুর বাসষ্ট্যান্ডের এনাব নাজেজ ও রাহেন জান্নাত ফেরদৌসী দম্পত্তির ছোট ছেলে এবং মরহুম আলহাজ্ব গিয়াস চৌধুরীর নাতি।
আশুলিয়ার ইউনিভার্সেল প্রি-ক্যাডেট স্কুলে আস-সাবুরের শিক্ষা জীবন শুরু হলেও শাহীন স্কুলেই কেটেছে তার শিক্ষা জীবনের বাকি সময়টুকু। ৩য় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত তার গৌরবজ্জল সময় কেটেছে শাহিন স্কুলে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বেপজা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে। ভর্তি পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান অর্জন করলেও সেখানে ভর্তি না করায় মায়ের প্রতি চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখে রেখেছেন “মা ভর্তি হতে দিলো না”।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আস-সাবুর খুব মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শাহীন স্কুলে ১ম স্থান অর্জন করে ১০ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। বেঁচে থাকলে এ বছর সে এসএসসি পরীক্ষা দিত এবং ভালো ফলাফল অর্জন করতো।
আস-সাবুরের মা রাহেন জান্নাত ফেরদৌসী আরো জানান, ছেলে হয়েও সংসারের অনেক কাজে মাকে সহযোগিতা করতো। রাত জেগে পড়াশোনা করার কারণে তার অভ্যাস ছিলো সে নিজেই চা কফি বানিয়ে ও ডিম ভেজে খেতো। ৪ আগষ্ট অনেক রাতে প্রাইভেট পড়ে বাসায় আসলে টেবিলে রাখা খাবার খেয়ে ফ্রিজে উঠিয়ে রাখতে বলেন মা রাহেন জান্নাত। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, সেদিন বাসায় মাত্র ১টি ডিম ছিল, ওকে বলেছিলাম বাবা ১টি মাত্র ডিম আছে. রাতে ডিমটি খেয়ো না, সকালে তোমাকে ভেজে দেব। ও কোন কথা না বলে শুধু হেসেছিল। ও নিয়মিত নামাজ পড়তো।
৫ আগষ্টও ফজরের নামাজ পড়েছে। সকালে বাসায় খাওয়ার কথা বললে প্রাইভেট পড়ে এসে খাবে বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে মিছিলে যায় সাবুর। যাওয়ার সময় ওর মুখটাও দেখতে পাননি মা। পরে দেখেন রাতের খাবারের পর চা-কফি বানিয়ে খাওয়ার সাথে ওই ডিমটিও খেয়েছিল সে। রাতের ওই খাওয়ায় বাড়িতে তার শেষ খাওয়া।
৫ আগষ্ট সকালে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে মিছিলে যোগ দেয় আস-সাবুর। পরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে আনন্দ মিছিল বের হলে সেখানেও যোগ দেয় সে। মিছিলটি এক সময় আশুলিয়া থানার সামনে গেলে পুলিশ এলোপাথারী গুলি চালায়। সে সময় কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকলে একের পর এক নিহত ও আহতদের পিকআপ ভ্যানে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় পুলিশ। এতে জীবন্তসহ ৭-৮ জন ছাত্র-জনতা পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়।
আস-সাবুরের মা রাহেন জান্নাত ফেরদৌসী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ওই দিন মিছিলে যাবার বিষয়টি সাবুর প্রথম জানায় তার ভাইকে। এ খবর শুনে মা রাহেন রাস্তায় বের হয়ে আসলে গুলিবিদ্ধ আহতদের নিয়ে যাওয়া লোকজনদের ছুটোছুটি দেখতে পান তিনি। কিন্ত ছেলে সাবুরের তার সাথে আর কথা না হয় না। মাঝে মাঝে বড় ভাই রিজওয়ান ও বন্ধুদের সাথে কথা বলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেয় সাবুর। পরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও সম্ভাব্য সকল স্থানে খুঁজেও তাকে না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন পরিবারের লোকজন।
পরদিন বিকেলে ছেলের সিমকার্ড দিয়ে আশুলিয়া থানার সামনে থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয় সেখানে তার অগ্নিদগ্ধ লাশ সেখানে আছে। খবর পেয়ে তারা আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় লাশ উদ্ধার করে সেনাসদস্যের উপস্থিতিতে আশুলিয়া থানার সামনেই ১ম প্রথম জানাজা, রাতে জামগড়ায় ২য় জানাজা শেষে ৭ আগষ্ট বুধবার ভোরে গ্রামের বাড়ি মহাদেবপুরে তার লাশ নিয়ে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *