বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা: মানবজাতির ভবিষ্যৎ

হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রতিনিধি আমেরিকা :  গত ১৩ মার্চ ২০২৬,শুক্রবার বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বিকাল সাডে ৩টায় পার্টির সভাপতি এম এ আলীম সরকারের সভাপতিত্বে ইফতার মাহফিল এবং “বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা: মানবজাতির ভবিষ্যৎ” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বিশ্বায়নের কথা উল্লেখ করে অনেকেই বলেছেন, এই কালে জাতি ও রাষ্ট্রের গুরুত্ব নেই। কথাটা ঠিক নয়। মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকান্ড জাতি ও রাষ্ট্রের সীমানা ভেদ করে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে এ কথা ঠিক। কিন্তু জাতি ও রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়নি। বিশ্ব-মানবতার কল্যাণে আজকের বাস্তবতা জাতি রাষ্ট্র ও আন্তরাষ্ট্রিক সম্পর্ককে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। রাজনৈতিক আদর্শ- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদিকে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। পৃথিবীব্যাপী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। আন্তরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান জাতিসংঘ নিতান্তই অপ্রতুল। জাতিসংঘকে কালের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্গঠিত করতে হবে। মানবজাতিকে যুদ্ধমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করতে হবে। জাতিসংঘের কর্তৃত্বে একটি সেনাবাহিনী রেখে পর্যায়ক্রমে সকল রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করতে হবে। রাষ্ট্র পর্যায়ে জনজীবনের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রমিক বিভিন্নস্তরের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ আলোচক অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ তাদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বব্যবস্থা এবং নানা রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই বিশ্ব ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সমূহের লক্ষ্য হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে সকল দেশের সকল মানুষের অন্ন বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কিন্তু অন্যান্য বিশ্ব ব্যবস্থা, পরাশক্তিগুলোর নানা স্বার্থ, বৈষম্য ও লোভের কারণে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। আজ সতর প্রকাশিত হয়েছে – ‘আক্রমণ করল আমেরিকা- ইসরাইল, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ নিন্দা করল ইরানের।’ এ ধরনের একটি বৈপরীত্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার জন্য পৃথিবীর হানাহানি, যুদ্ধ, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণ বন্ধ করা যায়নি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, গণতন্ত্র ও জনসাধারণের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সকল মানুষের শিক্ষা- স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন, সেটি আমাদের নেই।
৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ড: মুহাম্মদ ইউনুস তার সাঙ্গঁপাঙ্গঁদের নিয়ে মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে সরকার দখল করে বাংলাদেশকে উগ্র ধর্মান্ধদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। ডঃ ইউনুস দেশে এক মবের রাজত্ব কায়েম করে বাংলাদেশকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে নিয়ে এসেছে। যাইহোক, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইউনুস, তার সাঙ্গঁপাঙ্গঁ এবং উগ্রবাদীদের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে। প্রত্যাশা করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক ও অর্থনীতিক অগ্রগতির প্রক্রিয়ায় সামনে এগিয়ে যাবে।

সভাপতির বক্তব্যে এম এ আলীম সরকার বলেন, বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘ কর্তৃক যে বিশ্বব্যবস্থা রয়েছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার প্রশ্নই অবান্তর। মানবজাতির পারস্পরিক সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। তাই বিশ্ব ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠেছে। ধর্ম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং বিশ্ব-মানবতার প্রচলিত ধারণাগুলো মানবসভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমান সময়ের জটিল বাস্তবতায় সেগুলো নতুনভাবে চিন্তা ও মূল্যায়নের দাবি রাখে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্ব এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গোটাপৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় জাতিসংঘ কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কার্যকর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ পুনর্গঠন করে নতুনভাবে বিশ্বরাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীব্যাপী জনগণের চাহিদা, মানববিধ্বংসী সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে মানবকল্যাণের জন্য সুদূরপ্রসারী চিন্তা করা প্রয়োজন। ক্ষুধামুক্ত বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী চাই। এম এ আলীম সরকার আরও বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও গত ৫৫ বছরে গণতন্ত্র আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ, এখন আর বাংলাদেশের জনগণের ও রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ডঃ মুহাম্মাদ ইউনুস বাংলাদেশকে একটি অগ্নিগর্ভে রেখে গিয়েছে। ইউনুস পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করেনি। ডঃ ইউনূসের কাছে জাতির অনেক প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ইউনূসের সবচেয়ে সফলতা হলো মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করা, যা পৃথিবীর কোনো দেশেই এই মব সন্ত্রাসের প্রবণতা নেই। গত ১৮ মাসে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ঘুমাতে পারেনি, চলতে পারেনি এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারেনি। এখন মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। বাকস্বাধীনতা একেবারেই ছিল না। মব সন্ত্রাসের ভয়ে পুরো জাতি আতঙ্কিত অবস্থায় ছিল। ড. ইউনুস বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধের যে বীজ বপন করে দিয়ে গিয়েছে, তা জনগণ কিছুদিন পরে উপলব্ধি করতে পারবে। দেশে প্রয়োজন দুর্নীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় রাজনীতি। আরও বক্তব্য রাখেন, চরচা সম্পাদক ও কবি সোহরাব হাসান, এফবিসিসিআই এর সাবেক পরিচালক ও উপদেষ্টা এবং বারভিডার প্রেসিডেন্ট আবদুল হক ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রমুখ। উক্ত আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন, পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক অমূল্য কুমার বৈদ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *