বেনাপোলে আমদানিকৃত কাঁচামাল শত ভাগ পরীক্ষণ না করায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব

মো: আনিছুর রহমান, বেনাপোল প্রতিনিধি: দেশের সর্বোবৃহৎ স্থল বন্দর বেনাপোল। এই পথে ভারত থেকে সিংহভাগ আমদানি পণ্য আসে। এর মধ্যে ট্রাক টু ট্রাক খালাসকৃত পণ্য পচনশীল পণ্য কাঁচামাল। আর এই কাচামালের মাঠে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।  ওজনে পরিমাপ কম দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার শুল্ক ফাকি দিয়ে কাচামালের সাথে অন্যান্য পণ্য চলে যাচ্ছে দেশের অভ্যান্তরে। আর এর সাথে জড়িত রয়েছে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের অসাধু কর্মকর্তারা। এর আগে এই মাঠ থেকে আমদানিকৃত কাচামালের মধ্যে থেকে উদ্ধার হয়েছে ফেসসিডিল, মদ ও নেশাজাতীয় ঔষধ। এতে করে শতভাগ পণ্য পরীক্ষা করলে সরকারের রাজস্বও কম হবে এবং অবৈধ পণ্যর চালান ও প্রবেশ বন্ধ হবে বলে অনেকে মতামত প্রকাশ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকৃত পচনশীল পণ্য চালানে মাছ ও ফলের মধ্যে লুকানো থাকে উচ্চ শুল্কযুক্ত ও মিথ্যা ঘোষনার পণ্য। পরীণ কর্মকর্তারা পণ্য চালান পরীণের সময় ট্রাকের পেছন ও উপর থেকে কয়েকটি কার্টুন ও ট্রে নামিয়ে পরীণ সম্পূর্ন করেন। ফলে অধরা থেকে যায় মিথ্যা ঘোষণার আনা পন্য চালান। পরীণ দুর্নীতিবাজ কর্মকার্তাদের অর্থ লোভের কারনে আক্রান্ত হচ্ছে রাজস্ব প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তি আর হুমকির মুখে পড়েছে প্রশাসনিক শুদ্ধাচার।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কাঁচামাল পণ্যের ট্রাক প্রতি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘুসের চিত্র, মাছের ট্রাক প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আনারের ট্রাক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আপেলের ট্রাক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, কমলার ট্রাক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, কেনুর ট্রাক ২০ হাজার টাকা, আঙ্গুরের ট্রাক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং পানের ট্রাক ১০ হাজার টাকা করে আদায় করে দায়িত্বরত পরীণ কর্মকর্তারা এবং আদায়কারীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকে। তাছাড়া এই পচনশীল পণ্যের শুল্কায়ন গ্রুপ-১ এর রাজস্ব কর্মকর্তা যখন যিনি থাকেন তখন প্রতি কনসাইনমেন্ট প্রতি ৫ হাজার টাকা ঘুস নিয়ে থাকেন।সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোল বন্দরে শুল্ক ফাঁকি প্রধান উৎস হলো পরীণ রিপোর্টের কারনে আমদানিকৃত পণ্য চালান কায়িক পরীা শেষে শুল্কারোপসহ শুল্কায়ন করা হয়ে থাকে। শুল্কায়ন গ্রুপের কর্মকর্তারা পরীণ কর্মকর্তার নথী পর্যালোচনা করে শুল্কায়নের আগে পণ্যের প্রকৃতি,পরিমাণ,ওজন ও মান যাচাই বাছাইসহ ইনভয়েস,প্যাকিং লিস্ট,বিল অব এন্ট্রি, এলসি কাগজপত্রের সাথে পণ্যের মিল আছে কি না তা নিশ্চিত সহ সন্দেহজনক চালান চিহ্নিত হলে পূনরায় পরীণ করতে পারেন। কিন্তু পরীণ রিপোর্ট অনুযায়ী শুল্কায়ন শাখায় বসে পণ্য চালান খালাস করে থাকেন দু-একটি চালান পূনরায় দেখার কথা বললে পচনশীল পণ্যের অজুহাতে একটু বাড়তি টাকায় মিলে যায় পণ্য খালাশ।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বেনাপোল বন্দরে গভীর রাত পর্যন্ত পচনলীল পণ্যে প্রবেশ করে। দিনে প্রবেশকৃত ট্রাক গুলো শুল্কফাঁকির পণ্য কম আসে কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরে যে গাড়িগুলো প্রবেশ করে সে সকল পণ্যের ট্রাক গুলোতে পরীণ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কোন পরীণ না করেই ভারতীয় গাড়ী টু বাংলা গাড়ীতে লোড দিয়ে বন্দরে থেকে খালাশ নিয়ে চলে যায়। এছাড়া শুল্কফাঁকির চক্রটি দ্রুত খালাশের নামে চালাকি করে শুল্কফাঁকির ট্রাক গুলো “দিনে শুল্কায়ন চালানের কাগজপত্র চালানের কাগজপত্র ব্যবহার করে”। ভারত থেকে রাতে আগত ট্রাক গুলোতে বৈধ পণ্যের সাথে লুকিয়ে আনা হয় উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য। তার মধ্যে জিলেট ব্লেড,ঔষধ,নিশিদ্ধ মেডিসিন,শাড়ী থ্রি-পিসসহ আগ্নেয় অস্ত্রের চালানও চলে যাচ্ছে অহরহ। গাড়ি থেকে গাড়ি লোডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বর্তমান কাঁচামালের মাঠ “রাজস্ব ফাঁকির রাতের বাজার” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গত ১৩ জানুয়ারি-২৬ রাতে বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর কাঁচামালের শেডে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঘোষনাবর্হিভূত আমদানিকৃত দুটি ভারতীয় মাছের ট্রাক (ডাব্লিউ বি-২৫কে-৩০২৯ ও ডাব্লিউ  বি ১১ই-৫০২৭) মাছের ট্রাক আটক করে কাস্টমস কর্তৃপ। চালানটিতে শুল্কফাঁকির প্রায় সাড়ে ৩ টন ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা। গত ৫ই আগষ্ট-২৪ আ.লীগ সরকার পতনের পর দীর্ঘ দেড় বছর পর কাঁচামালের শেড থেকে শুল্কফাঁকির চালান আটকের ঘটনা এটিই প্রথম। গত ১১ জানুয়ারি-২৬ বেনাপোল পোর্ট থানার রঘুনাথপুরে র‌্যাবের অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি ও চারটি ম্যাগজিন উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় সাকিব হাসান নামে এক যুবককে আটক করে র‌্যাব। সাকিব বেনাপোল বন্দরে একটি কাঁচামাল আমদানিকারকের অফিসে কাজ করত বলে জানা যায়। গত ৭ সেপ্টেম্বর-২০২৫ আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের আড়ালে লুকানো ভারতীয় সিজি-০৪-পিইউ-৫২৮৮ নম্বরের ট্রাক থেকে একটি পিস্তল ও ৯৩ রাউন্ড গুলিসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করে (বিজিবি)।

সচ্ছ আমদানিকারকরা জানান, পরীণ রিপোর্ট অনুসারে গ্রুপ শুল্কায়ন কর্মকর্তা পণ্য খালাশের অনুমতি প্রদান করে থকে সরাসরি পণ্যর তারতম্য পরীণের সময় বুঝতে পারে। আবার নিয়মমাফিক ঘুস নেওয়ার কারনেও তারা শতভাগ পরীণ করে না। ঘুসের কারনে পরীণ রিপোর্ট মিলে যায় ১০০% সঠিক। একারনে শুল্কফাঁকি রোধে প্রতিটি পরীণের সময় বিজিবিকে রাখা হলে শুল্কফাঁকি জিরো টলারেন্সে নেমে যাবে। এছাড়া পণ্য চালান লোডের সময় বিজিবির চেকিং ইউনিট রাখতে হবে। দ্রুত পচনশীল পন্য খালাসের নামে শুল্কফাঁকির লাগাম টানতে বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রানশিপমেন্ট ইয়ার্ডের ছোটআঁচড়া গেটে বিজিবির বাঁশকল চেকিং রাখলে থেমে যাবে শুল্কফাঁকি। দেশের কল্যানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আসবে বিরাট সাফল্য।

এ বিষয় ফলের কার্টুন ওজন এর সময় ওজন পরিমাপ সঠিক আছে কি না জনৈক এ আরও তা জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করে। তিনি বলেন ওজন সঠিক আছে কিনা উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *