যুক্তরাষ্ট্রে ঝুঁকির মুখে লাখ লাখ পরিবার স্ন্যাপ সুবিধা পেতে নতুন শর্ত কার্যকর

হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রতিনিধি আমেরিকা :  গত রবিবার,১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্লিমেন্টারি নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামে নতুন কাজের শর্ত কার্যকর হয়েছে। এর ফলে লাখ লাখ আমেরিকান তাদের স্ন্যাপ সুবিধা হারাতে পারেন। বর্তমানে স্বল্প-আয়ের প্রায় ৪২ মিলিয়ন পরিবার দৈনন্দিন বাজার-খরচ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য এই ফেডারেল কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে।

গত বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হওয়া একটি বৃহৎ বিলের আওতায় স্ন্যাপের কাজের শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তিন মাসের বেশি সময় স্ন্যাপ সুবিধা পেতে হলে কাজের শর্ত পূরণ করতে হবে।

নতুন আইনের অধীনে, নির্ভরশীল নেই এমন সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কাজের শর্ত প্রযোজ্য হওয়ার উচ্চ বয়সসীমা প্রথমবারের মতো ৫৪ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করা হয়েছে।।

এছাড়াও ১৮ বছরের নিচে নির্ভরশীল সন্তানের দায়িত্বে থাকা বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য থাকা ছাড়-এর নিয়ম বদলানো হয়েছে। এখন ১৪ বছরের নিচে সন্তানের দেখভাল করছেন—এমন ব্যক্তিরাই কেবল ছাড় পাবেন; আগে এই সীমা বেশি ছিল।

নন-প্রফিট সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি আমেরিকার সিইও জোয়েল বার্গ এবিসি নিউজকে বলেন, “অপ্রয়োজনীয়ভাবে লাখ লাখ মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তারা নিজেদের এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার হারাবে। স্যুপ কিচেন, ফুড প্যান্ট্রি এবং যেসব ফুড ব্যাংক এগুলোকে সরবরাহ করে—তাদের কাছে এই বাড়তি চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ থাকবে না।”

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) আগস্ট ২০২৫-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ মানুষ স্ন্যাপ সুবিধা হারাতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে- ৬৪ বছর পর্যন্ত বয়সী প্রায় ৮ লাখ সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক, যাদের কোনো নির্ভরশীল নেই এবং এবং ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী সন্তানের অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়ক প্রায় ৩ লাখ মানুষ।

এছাড়া, ১৮ থেকে ৫৪ বছর বয়সী (অথবা ২০৩১ সাল থেকে ১৮ থেকে ৪৯ বছর) এমন প্রায় ১০ লাখ সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক, যাদের কোনো নির্ভরশীল নেই এবং যারা আগে কাজের শর্ত থেকে ছাড় পেতেন—তারাও সুবিধা হারাতে পারেন।

এই বৃহৎ বিলের মাধ্যমে গৃহহীন ব্যক্তি, সামরিক ভেটেরান এবং ১৮ বছরে পৌঁছানোর সময় ফস্টার কেয়ারে থাকা তরুণদের জন্য থাকা ছাড়ও বাতিল করা হয়েছে।

বার্গ বলেন, এই জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু চাকরি পাওয়াই নয়, বরং সরকারকে প্রমাণ দেখানো যে তারা কাজের শর্ত পূরণ করছেন—তা অত্যন্ত কঠিন হবে।
“এটা তাদের জন্য অসম্ভবের কাছাকাছি কঠিন হবে, আর তারা এমনিতেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আমেরিকানদের মধ্যে পড়ে,” তিনি বলেন। “গৃহহীন মানুষ, ভেটেরান এবং ফস্টার কেয়ার থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা তরুণরা—তাদের খাবার, বাজার-সামগ্রী সব হারাবে, আর সেটা ঠিক করার কোনো পরিকল্পনাও নেই।”

সিবিও-এর হিসাব অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে স্ন্যাপে অংশগ্রহণ কমলেও, আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের মধ্যে অংশগ্রহণ বাড়বে, কারণ নতুন আইনে তারা ছাড় পেয়েছেন—ফলে কিছুটা ভারসাম্য আসবে।

কাজের শর্তের সমর্থকদের মতে, এই নিয়মগুলো অপচয়, জালিয়াতি ও অপব্যবহার রোধের জন্য প্রয়োজনীয়। স্ন্যাপ কর্মসূচি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের (ইউএসডিএ) অধীনস্থ ফুড নিউট্রিশন সার্ভিস (এফএনএস)।

এগ্রিকালচার সেক্রেটারি ব্রুক রোলিন্স শুক্রবার ফক্স বিজনেস-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘স্ন্যাপ সুবিধা অস্থায়ী ব্যবহারের জন্য, দীর্ঘমেয়াদে থাকার জন্য নয়। ‘আমেরিকান ড্রিম’ মানে খাদ্য ভাতা কর্মসূচিতে থাকা নয়। ‘আমেরিকান ড্রিম’ মানে এসব কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল থাকা নয়। এগুলো সহায়তা হওয়া উচিত, ভিক্ষা নয়। … গতকাল পর্যন্ত আমরা প্রায় ১৭ লাখ মানুষকে স্ন্যাপ থেকে বের করে এনেছি।”

এবিসি নিউজ-কে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইউএসডিএ-র এক মুখপাত্র বলেন, রাজ্য সংস্থাগুলোকে “যেসব এলাকায় কোনো ছাড় নেই, সেখানে সময়সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”

মুখপাত্র আরও বলেন, “বিভাগটি রাজ্য সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এর মধ্যে নির্দেশনা ও রাজ্যভিত্তিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত—যাতে সময়সীমা ও সংশ্লিষ্ট কাজের শর্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, যোগ্য সুবিধাভোগীদের কল্যাণ থেকে কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সুযোগে নিয়ে যাওয়া যায়।”

২০২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সারভে-এর তথ্য অনুযায়ী, স্ন্যাপ পাওয়া অধিকাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে গত ১২ মাসে অন্তত একজন পরিবার-সদস্য কাজ করেছেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের শর্ত প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ কমাতে পারে। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চ-এর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ন্যাপ-এর কাজের শর্ত কার্যকর হলে ১৮ মাসের মধ্যে যোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বোচ্চ ৫৩% কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।

বার্গ বলেন, “এই কাজের শর্তগুলো আসলে কাজকে উৎসাহিত করার জন্য নয়। এগুলো মানুষকে অমানবিক করা এবং ‘অন্যদের’ আক্রমণ করার একটি উপায়। অধিকাংশ স্ন্যাপ সুবিধাভোগীই কাজের পক্ষে এবং অধিকাংশই ইতিমধ্যে কাজ করছেন—অথবা তারা শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা বয়স্ক আমেরিকান। তাই এই পুরো বিতর্কটাই একধরনের দৃষ্টি-ভ্রান্তি।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *