যুদ্ধে নামলে ধ্বংস হবে দুবাই-আবুধাবি -অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকস

হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রতিনিধি আমেরিকা :  মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেফ্রি স্যাকস।

তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে দুবাই ও আবুধাবির মতো বিশ্বমানের শহরগুলো সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে শুধু নিরাপত্তাই নয়, আমিরাতের অর্থনৈতিক মডেলও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকস এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি এই যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে দুবাই ও আবুধাবি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’

তিনি বলেন, এই শহরগুলো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, আর এটিই চলমান সংঘাতে তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

স্যাকস বলেন, এই শহরগুলোর পরিচয়ই তাদের দুর্বলতা। তার ভাষায়, ‘এগুলো অবকাশযাপন কেন্দ্র, পর্যটনের জায়গা। এগুলো কোনও দুর্গ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এলাকা নয়। এখানে ধনী মানুষ আসে, বিনিয়োগ করে, আনন্দ করে’। তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের শহরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা মানেই এর মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস করা।’

স্যাকস মনে করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত অবস্থান একটি বড় ভুল হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমিরাত নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। আর আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপকে তিনি ‘বিপর্যয়ের আমন্ত্রণ’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

মূলত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। জেফ্রি স্যাকসের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছে এবং ভেবেছে এতে তারা আঞ্চলিক হুমকি থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

তিনি বলেন, ‘তারা ভেবেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে, তাই তারা আমাদের রক্ষা করবে, এটা বড় ধরনের ভুল হিসাব।’

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বহুল আলোচিত মন্তব্য তুলে ধরে স্যাকস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু বন্ধু হওয়াটা কখনও কখনও আরও মারাত্মক হতে পারে।’

এন অবস্থায় স্যাকস আমিরাতের নেতৃত্বকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন, পরিস্থিতি বুঝুন। একটি ভুল পথে আরও এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, কিন্তু তারা সেটাই করছে।’

স্যাকসের এই মন্তব্যের আগেই অবশ্য ইরানও এ বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করেছে। গত ২০ মার্চ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোকে উদ্ধেশ্য করে বলেছিল, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ডের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে না দেয়।

তেহরান বলেছে, এসব ঘাঁটি বর্তমান সংকটের ‘মূল কারণ’ এবং এগুলো ব্যবহার করতে দেয়া মানে সরাসরি আগ্রাসনে অংশ নেয়া। এমনকি ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, এসব ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

ট্রাম্পের মনোযোগ এখন ইরানের ৪০০ কেজি ইউরেনিয়ামে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও রয়েছেন। এর জবাবে ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এতে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার ও বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।

অবশ্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে তাদের সমন্বয় বাড়ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে যে তাদের কৌশলগত জোট কি নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে? দুবাই ও আবুধাবির মতো শহরের জন্য এই প্রশ্ন কেবল ভূরাজনীতির নয়; বরং তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *