“ ক্ষণকাল “
মুহম্মদ আজিজুল হক-চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূতঃ গত দু’বছরে আমি এত সমকালিক আত্মীয়, বন্ধু, ব্যাচমেট, এবং পরিচিতজনদের হারিয়েছি যে এখন মৃত্যুচিন্তাটি আঠার মত লেগে থাকে মানস পটে; এবং এটি সাংসারিক ও বৈষয়িক বিষয়ে ঔদাসীন্য এনে দিচ্ছে আমার মন ও মননে। অতি সম্প্রতি হারিয়েছি আমার স্ত্রীর ইমিডিয়েট ছোট বোনের স্বামী, অর্থাৎ আমার ভায়রা, প্রফেসর আবু বকর ছিদ্দিককে। আমি তাঁকে ছিদ্দিক ব’লে ডাকতাম। মাত্র বছর দুই পূর্বে একটি সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ পদ হতে তিনি রিটায়ার করেছিলেন। বিরল কিছু চারিত্রিক গুণের জন্য তিনি শুধু আমার স্নেহভাজনই ছিলেন না, ছিলেন আমার শ্রদ্ধাস্পদও। তাঁর যে গুণটি আমাকে সবথেকে বেশি আকৃষ্ট করতো, সেটি ছিল তাঁর ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা। আল্লাহর ওপর তাঁর অগাধ, অটল ও নিঃশর্ত বিশ্বাস আমাকে বিস্মিত করতো। একদিন তিনি আমাকে বললেন, “দুলাভাই, আমার জ্ঞান হবার পর জীবনে আমি কখনো কোনো নামাজ কাযা করি নি।” শুনে আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম। আজকের দিনে ক’জন মানুষ এমন দাবি করতে পারে! ছিদ্দিক নন-শরীয়াহ ব্যাংকে টাকা রাখলে কখনোই তাঁর টাকার ওপর অর্জিত সুদ নিতেন না। তাঁর তাকওয়ার সঙ্গে সংগতি রেখে তিনি ছিলেন সততা ও সাধুতার মূর্ত প্রতীক। গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলায় অবস্থিত রামদিয়া সরকারি এস কে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্বপালনে এবং আর্থিক বিষয়ে যে সততার নজির স্থাপন করেছিলেন তার স্বীকৃ্তিস্বরূপ তিনি সরকার কর্তৃক একাধিকবার উক্ত উপজেলার সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবে ঘোষিত হয়ে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। বিরল গুণের এই মানুষটিকে আমি কখনো কেউকে কোনো কটু কথা বলতে শুনি নি। কারো সাথে ঝগড়াঝাটি করতে দেখি নি। ভীষণ নিরীহ এ মানুষটির মন ছিল এক খন্ড পরিষ্কার কাচের মতো স্বচ্ছ। এতটাই সরল ছিল তাঁর মন যে, কেউ তাঁকে ঠাট্টাচ্ছলে কোনো কথা বললেও তিনি তা সত্য বলেই ধরে নিতেন। বহুবার তাঁর পরিবারকে অনেক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করতে হয়েছে। কিন্তু কখনোই তিনি আল্লাহর ওপর তাঁর অবিচল বিশ্বাস হারান নি। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসের শক্তিতে শক্তিমান হয়ে তিনি সেসব বিপদ-আপদ কাটিয়ে উঠতে সক্ষমও হয়েছেন। তাঁর ধর্মভীরুতা, সততা ও সাধুতার কারণে, তাঁর কথা স্মরণ হলেই, বা তাঁকে দেখলেই, আমার ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দিকের কথা মনে পড়তো। ঐ নামটিই তাঁর জন্য যথোপযুক্ত ছিল। নামটির সন্মান তিনি অক্ষুন্ন রেখে গেছেন পুরোমাত্রায়। চিন্তা-চেতনায় সরল-সোজা হলেও ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলেন ছিদ্দিক। রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে ম্যাথম্যাটিক্স ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলেন তিনি। মাষ্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পাশ করেছিলেন। আমার বিশ্বাস যে ছিদ্দিক তাঁর বিরল গুণসমূহ তাঁর পিতার নিকট হতে পেয়েছিলেন। তাঁর পিতা আলহাজ্জ তফসির উদ্দিন আহমদ চারবার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ, কর্তব্যপরায়ণ, এবং জনপ্রিয়। তিনি এখনো জীবিত। বয়স ৮৬ বছর। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর পুত্রের মৃত্যু যৎপরোনাস্তি মর্মবিদারক হয়েছে তাঁর জন্য। লোকে যেমনটি বলে, একজন পিতার জন্য সবচেয়ে ভারী বোঝা হচ্ছে তার সন্তানের লাশ। ছিদ্দিক ছিলেন তাঁর পিতার সুযোগ্য সন্তান। ছিদ্দিক ২০১৯ সালে সস্ত্রীক হজ্জ্বব্রত পালন করেছিলেন। (সস্ত্রীক আমিও ঐ বছর হজ্জ্বে গিয়েছিলাম।) অত্যন্ত একনিষ্ঠভাবে মক্কায় হজ্জ্বপালন শেষে মদিনার মসজিদে নববীতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছিলেন ছিদ্দিক, যা নির্বিঘ্নে সমাপন করা খুব সহজ কোনো কাজ নয়।
রামদিয়া এস কে কলেজের অধ্যক্ষের সরকারি বাসভবনের নাম ‘ক্ষণকাল’। সেই ‘ক্ষণকাল’-কে নিয়ে একটি ক্ষুদ্র কবিতা রচনা করেছিলেন অধ্যক্ষ ছিদ্দিক। একটি প্রস্তর-ফলকে কবিতার চরণ ক’টি খোদাই করে সেটি ঐ বাসভবনের ফটকে লাগানো হয়েছিল তাঁর ইচ্ছায়। ফরিদপুর জেলা শহর থেকে মাত্র সাত-আট কিলোমিটার দূরে তাঁদের গ্রামের বাড়ি। কিন্তু সিদ্দিক সপরিবার ফরিদপুর শহরে থাকতেন একটি ভাড়া করা বাসায়। গত কয়েক বছর পূর্বে একটি নির্মাণাধীন বারো তলা এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর আট তলায় একটি ২২০০ বর্গফুটের ফ্লাট কিনেছিলেন। সম্প্রতি, বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে ছিদ্দিকের পরিবার ফ্লাটটিতে উঠে যায়। ছিদ্দিক এবং তাঁর স্ত্রী তখন ঢাকায়। তিনি তখন একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত দেড় বছরে ছিদ্দিককে চিকিৎসার্থে বহুবার ফরিদপুর থেকে অ্যাম্বিউল্যান্সে ঢাকায় আসতে হয়েছে। হার্ট ফাউন্ডেশন, ইবনে সিনহা, বারডেমসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। বহু লক্ষ টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ডাক্তারগণ তাঁর শরীরে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো রোগ নির্ণয় করতে পারেন নি। বলেছেন তাঁর দেহে কোনো সিরিয়াস রোগ নেই। যেটি আছে সেটি তাঁর মানসিক রোগ। অথচ, আমাদের কাছে কখনো সেরূপ মনে হয় নি। শেষবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে গত ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে ছিদ্দিক ফরিদপুর ফিরে গিয়েছিলেন। এবার উঠেছিলেন তাঁর নিজের নতুন এ্যাপার্টমেন্টে। নিজের ঐ নতুন বাসায় ওঠাটা ছিল তাঁর স্বপ্ন। নতুন বাসায় একটি রুমকে পাঠকক্ষ হিসেবে সাজানো হয়েছে। বছর আড়াই আগে একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, “দুলাভাই, আমার একটি সুদীর্ঘকালের স্বপ্ন আমার নিজের বাসায় আমার একটি স্টাডি থাকবে। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর সেখানে বসে বসে আমি কোর’আন নিয়ে গবেষণা করবো। লেখালেখি করবো।” পাঠকক্ষে প্রবেশের দরোজার ডানপাশে দেয়ালে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী বসানো হয়েছে একটি প্রস্তর-ফলক, যার ওপর খোদিত হয়েছে তাঁর রচিত সেই ক্ষুদ্র কবিতাটি যেটি রামদিয়া এস কে কলেজে তাঁর অফিসিয়াল বাসভবনের জন্য তিনি রচনা কোরেছিলেনঃ
“হে স্রষ্টা, আমি তোমার,
গাহি তোমার স্তুতি।
ক্ষণকালে কেহ আসে কেহ যায়
রেখে যায় স্মৃতি।”
-প্রফেসর মোঃ আবু বকর ছিদ্দিক
অতিশয় দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতে হয় পাঠকক্ষে বসে কোর’আন নিয়ে গবেষণা করার সেই সযত্নে লালিত স্বপ্ন তাঁর পূ্রণ হয় নি। মাত্র চার-পাঁচদিন তিনি তাঁর নতুন বাসায় অসুস্থাবস্থায় কাটিয়েছিলেন। ক্ষণকালও তিনি তাঁর স্টাডিতে বসতে পারেন নি। ১৫ই ফেব্রুয়ারি দুপুরে জোহরের নামাজ আদায় কোরে লাঞ্চশেষে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, “মীরা, আমি একটু ঘুমোতে গেলাম।” সেই নিদ্রাই যে তাঁর চিরনিদ্রা হবে তা কেউই ভাবে নি। ‘কবর’ কবিতার কবি জসীম উদ্দীনের মতন জোড়হাত কোরে মোনাজাত করতে চাই, আয় খোদা! রহমান; জান্নাতে শাশ্বত শান্তিতে রেখো তুমি ছিদ্দিকের মৃত্যুব্যথিত প্রাণ।