বেনাপোল প্রতিনিধি: ভারত ও বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের বেড়াজালে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল। গত দুই বছরে ভারত কর্তৃক আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে বন্দরটি দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এতে যেমন দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কর্মহীন হয়ে পড়ছেন হাজারো শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়ে তা ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। আগে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য ভারতে রপ্তানি হতো, সেখানে এখন তা ২০ থেকে ১০০ ট্রাকের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ভারত থেকেও আমদানিকৃত ট্রাকের সংখ্যা ৪৫০-৫০০ থেকে কমে ২০০-৩০০টিতে ঠেকেছে।
রপ্তানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে ভারত ধাপে ধাপে বিভিন্ন পণ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সর্বশেষ ১১ আগস্ট বস্ত্র ও পাটজাত পণ্যের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। এর আগে গত বছরের এপ্রিল থেকে আকাশপথে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, মে মাসে তৈরি পোশাক, তুলা, প্লাস্টিক ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ এবং জুনে পাটজাত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অন্যদিকে, দেশীয় শিল্প রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারও ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বাণিজ্যিক এই স্থবিরতার কারণে বেনাপোলের শত শত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মালিক, কর্মচারী ও সহস্রাধিক শ্রমিক গভীর সংকটে পড়েছেন। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সেলিম বলেন, “ভারত এভাবে বাধা সৃষ্টি করলে আমাদের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিকল্প বাজার সম্প্রসারণে সরকারি কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো গেলে এই বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।”
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাণিজ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বন্দরকেন্দ্রিক সরকারি রাজস্ব আয়েও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তিনি আরও বলেন, “শুধু বাংলাদেশ নয়, এই সংকটে ভারতেরও বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে উভয় দেশের সরকারি পর্যায়ে এখন আলোচনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এই বাণিজ্যিক সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতাই এখন একমাত্র সমাধান। বন্দর সচল রাখতে এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অবিলম্বে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা জরুরি।