সিরাজুল ইসলাম আপন, চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া(পাবনা): আপন পাঁচ ভাইয়ের প্রতিশ্রুতির নিষ্ঠুর বলি হয়ে জীবনের শেষ সময়ে এসে খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর দিন কাটছে ৮০ বছরের বৃদ্ধা হালিমা খাতুনের। মাথার ওপর একখণ্ড ছাদ কিংবা দুমুঠো অন্নের জন্য এই বয়সে তাকে বেছে নিতে হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি। বাসস্থান এখন খোলা আকাশের নিচে এক চিলতে মাটি। পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাড় ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের চড়পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে এই নির্মম চিত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে প্রথম স্বামী বাদশা সরকার হালিমা খাতুনকে পরিত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অন্যত্র তাঁর আবার বিয়ে হলেও সেখানে তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। জীবনের নানা টানাপোড়েনের পর দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
তখন তাঁর ভাইয়েরা এক অভিনব শর্তে তাঁর দ্বিতীয় স্বামী থেকে পাওয়া সম্পদ বিক্রির টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। শর্ত ছিল সম্পদ বিক্রির টাকা তাদের দেওয়ার বিনিময়ে পাঁচ ভাই গফুর, জফের, রমজান, জাহিদুল ও আহেদ আলী ১০ দিন করে পালাক্রমে বোন হালিমাকে নিজের বাড়িতে রেখে ভরণপোষণ করবেন।
বোনকে খাওয়ানোর সেই প্রতিশ্রুতির কথা এখন পুরোপুরি ভুলে গেছেন ভাইয়েরা। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র বোন হয়েও আজ হালিমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। শেষ বয়সে এসে বাবার রেখে যাওয়া মাত্র আড়াই শতাংশ জমি ভাইদের কাছে দাবি করায় উল্টো চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে তাকে। ভাইয়েরা এখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা হালিমাকে কোনো সম্পত্তি বা অংশ দেবেন না এবং ঘরেও ঠাঁই দেবেন না।
সরেজমিনে চড়পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে কিছু পলিথিন আর খড় দিয়ে একটি ছোট্ট গাছের নিচে রাতের শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বৃদ্ধা হালিমা। চারপাশে খোলা মাঠ। প্রচণ্ড রোদ আর বৃষ্টির মধ্যেও বৃদ্ধার এই মানবেতর জীবনযাপন দেখে স্থানীয় এলাকাবাসী ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁর ভাইদের সাথে কথা বলেও কোনো সুরাহা করতে পারেননি। বর্তমানে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারে কোনোমতে বেঁচে আছেন তিনি।
হালিমার ভাইদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা সেখান থেকে সটকে পরে। তবে হালিমার ভাতিজার স্ত্রী রেনু খাতুন বলেন, আমারা গরীব মানুষ। আমার শ্বশুরদের (তার শ্বশুর ও তাদের ভাই) সবারই ছেলে মেয়ে আছে আমাদেরই থাকার জায়গা নেই। তবু আমি আমার ভাঙা ঘরেই তাকে রেখেছিলাম কিন্তু বাড়িতে লোক আসায় তাকে অন্য জায়গায় থাকতে বলা হলে তিনি গাছেন নিচে জিদ করে থাকেন।
এই বিষয়ে পাড়-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হেদায়েতুল হক বলেন, বিষয়টি আমি অবগত আছি। এই বিষয়ের প্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে অনেকবার সালিশ-বৈঠক ডাকা হলেও ভাইদের জেদ ও অমানবিকতার কারণে কোনো সমাধান করা যায় নাই।
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টা আপনার মাধ্যমে অবগত হলাম। খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।