বেনাপোল বন্দরে পণ্য চুরি: রহস্যে ঘেরা ৩ হাজার কেজি পণ্য গায়েব, ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বেনাপোল প্রতিনিধি: বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাক থেকে টনকে টন মালামাল গায়েবের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পণ্যচালানটিতে ঘোষিত ওজনের চেয়ে ৩ হাজার ১৭৭ কেজি মালামাল কম পাওয়ায় বন্দর ও কাস্টমস এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। নেপথ্যে কোনো বড় চোরাচালান চক্রের কারসাজি রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর অনুসন্ধান চলছে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ভারত থেকে মেসার্স আরিফ এন্টারপ্রাইজের নামে ১০ টন ৯০ কেজি খৈল নিয়ে একটি ভারতীয় ট্রাক (ডাব্লিউ বি ২৫-কে-৮৪১৫) গত ২৩ জুন রাতে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। কিন্তু ২৫ জুন দুপুরে বন্দর এলাকা থেকে বের হওয়ার সময় ট্রাকটি বেনাপোল পোর্ট থানাধীন এলাকা থেকে অবৈধভাবে পণ্য খালাস করে। বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. ওবাইদুল মিয়ার দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, ট্রাকটি থেকে অবৈধভাবে ৪০টি প্যাকেজ একটি বাংলাদেশি ট্রাকে (ঢাকা মেট্রো-ট-২২-২১৭৮) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বন্দরের ওয়েব্রিজ স্কেলে ওজন করে দেখা যায়, ঘোষিত ওজনের তুলনায় ২ হাজার ৯৪৮ কেজি থেকে ৩ হাজার ১৭৭ কেজি পর্যন্ত পণ্যের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘটনায় ট্রাকের চালক মো. ইব্রাহিম খলিল ও হেলপার মো. সালাম হোসেনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। হেলপার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ভারতীয় গাড়ি থেকে ৩৩ নম্বর শেডে মোটর পার্টস অথবা সাইকেল পার্টস নামিয়ে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সেই মালামাল নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

এই ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে বিবাদী করে বেনাপোল পোর্ট থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছে। মামলার বিবাদীদের মধ্যে রয়েছেন: ১. ট্রাক চালক মো. ইব্রাহিম খলিল, ২. হেলপার মো. সালাম হোসেন, ৩. আনসার সদস্য আমিরুল ইসলাম, ৪. জিল্লুর রহমান, ৫. রাসূল ফকির, ৬. বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী মো. রাতুল, ৭. মো. নূরুল হুদা, ৮. রাজু আহমেদ, ৯. বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী আসাদুল এবং ১০. ছোট আঁচড়া বাঁশকলের কাস্টমস কর্মকর্তা/কর্মচারী। মামলা নং- ২৮, তারিখ: ২৭/০৬/২০২৬। এছাড়া অজ্ঞাতনামা কাস্টমস কর্মকর্তা/কর্মচারী ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার সাথে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের মালিক হাফিজুর রহমান হ্যাপী সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক খলিলুর রহমান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পণ্য চুরির উৎস ও ট্রাক থেকে ঠিক কী কী সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তা বের করার চেষ্টা চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, হাফিজুর, বেনাপোলের সামাদ ও আজিম—এই দুই ভাইয়ের সাথে মিলে দীর্ঘদিন যাবৎ ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের আড়ালে অবৈধ পণ্য নিয়ে আসছেন। তারা সব ঘাট ‘ম্যানেজ’ করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।

এই ঘটনা বন্দর এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল। তবে ৩১ নম্বর মাঠে ভারতীয় যে গাড়িটি খৈল নিয়ে এসেছিল, তা এখনো আটক রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *