সিলেটে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের অন্তরালে ছিল চুরি, প্রেম ও শারিরিক সম্পর্ক নয়

আবুল কাশেম রুমন, সিলেট প্রতিনিধি : সিলেট নগরের রায়নগরে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডার নিয়ে এবার নতুন তথ্য মিলেছে। প্রেম বা শারিরীক সম্পর্ক নয়, চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলার কারণেই তিন জনকে হত্যা করেন এই মামলায় গ্রেপ্তার বাবুল।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে ও আদালতে জবানবন্দিতে বাবুল মিয়াই এমন তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি স্ত্রূ। যদিও এরআগে পুলিশ বলেছিলো, গৃহকর্মীর সাথে প্রেম ও শারিরীক সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়ে তিন জনকে খুন করেন বাবুল। এ হত্যাকান্ডের দায় ঘটনায় দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি বাবুল মিয়া। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট ২০২৬ইং) সন্ধ্যায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে তিনি এই জবানবন্দী দেন।
বাবুল মিয়ার দায় স্বীকার করে জবানবন্দির তথ্য নিশ্চিত করে সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করেছে। তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে স্বীকারোক্তির বিস্তারিত তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।
এর আগে ৪ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবুল মিয়াকে আদালতে তুলে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশের কাছে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বললেও রিমান্ডে বলেছেন ভিন্ন কথা।
বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড়ে চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলায় প্রথমে গৃহপরিচারিকা, তারপর গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্তাকে একাই খুন করার কথা রিমান্ডে জানান বাবুল মিয়া। জবানবন্দি শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।
পুলিশের ওই সূত্র জানায়, রিমান্ডের সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছিল, বাসা ভাড়ার জন্য সে অনেক চাপের মধ্যে ছিলেন। এই টাকা জোগাড় করতেই তিনি এই বাসায় চুরি করতে যান। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে একাই ৩টি খুন করে বাবুল।
পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, কিন্তু বাসায় ঢোকার পর গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের কাছে ধরা পড়ে যান বাবুল। এরপর একে একে গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম, গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও বাবুল একই রকম বক্তব্য দিয়েছেন বলে পুলিশের এই সূত্রটি দাবি করেছে।
বাবুলের বরাত দিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানন, আব্দুস সাত্তারের বাসায় ঢোকার পরপরই গৃহকর্মী তাহমিনার মুখোমুখি হন বাবুল। তাকে দেখে তাহমিনা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পেছন থেকে তাহমিনাকে ধরে ফেলেন বাবুল এবং হাতে থাকা ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন। তাহমিনা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার পরও তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে ছুরিকাঘাত চালিয়ে যান বাবুল।
তাহমিনার চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেখানে ছুটে আসেন। তিনি বাবুলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তার পিঠে হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এ সময় পেছনে না তাকিয়েই ছুরি চালান বাবুল। ছুরিটি সুরাইয়া  বেগমের গলায় বিদ্ধ হয়। তিনি মেঝেতে পড়ে গেলে পরে আরও কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন বাবুল।
এরপর একই ভাবে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন বলে বাবুল জানায়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও একই বক্তব্য দিয়েছেন বলেও পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান।
বাবুল মিয়া তার জবানবন্দিতে বলে, তিন জনকে খুনের পর সে তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করার জন্য বাথরুমে যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে একটি কক্ষে টাকা-পয়সা খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে কিছু ৫০০ টাকার নোট পায় যা পরে গুনে  দেখে ১৫ হাজার টাকা। বাসার আরও কিছু নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাসার মোবাইল ফোন বেজে ওঠা ও মূল দরজার পাশে  কেউ কথা বলার কারণে দ্রুত সেই বারান্দা দিয়েই নিচে নেমে যান বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাবুল মিয়া উল্লেখ করেছে বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্ণনা করেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বৃহস্পতিবার জানান, চার দিনের রিমান্ড  শেষে বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে  তোলা হয়।

এ সময় বাবুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানা তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ  দেন।
প্রসঙ্গত, ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলায় তিন জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *