পচন যখন গোড়ায়: একটি ডিম হাতিয়ে নেওয়া ও আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দেউলিয়াত্ব

নিকোলাস বিশ্বাস – যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে হতাশাজনক, ক্ষোভমিশ্রিতএবং নির্মম সত্য আর কী হতে পারে? কিন্তু এই গভীর হতাশা তো কোনোআকস্মিক শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নিএটি আমাদের প্রতিদিনের যাপিতজীবন, আমাদের চারপাশের চেনা মানুষ এবং আমাদের নিজেদেরইতৈরি এক সম্মিলিত অবক্ষয়ের অমোঘ ফসলআমরা প্রতিনিয়তক্ষমতার শীর্ষবিন্দুর মেগা-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, হাজার কোটি টাকারব্যাংক লোপাট নিয়ে টকশোতে কিংবা চায়ের কাপে ঝড় তুলিকিন্তুআমাদের সমাজের একেবারে ভেতরটা, সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব যেকতটা জীর্ণ এবং ঘুণপোকা-ধরা হয়ে গেছে, তা আমরা কৌশলে এড়িয়েযাইআমরা ভাবি, দুর্নীতি কেবল ওপরের স্তরের মানুষের একচেটিয়াঅধিকারঅথচ আসল সত্য হলো, ক্ষমতার ক্ষুদ্রতম সুযোগ পেলেওআমাদের সাধারণ নাগরিকের বড় অংশই সেই একই অনৈতিকতার চর্চাকরে, যা বড় বড় লুটেরারা করে থাকে

ডিম চুরির উপাখ্যান, একটি জাতীয় চরিত্রের দর্পণ: সম্প্রতি ঘটেযাওয়া একটি ছোট, অথচ চরম প্রতীকী ঘটনা আমাদের এই ভেতরেরকদর্য রূপটাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেঘটনাটি স্রেফএকজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি একটি সামষ্টিক চারিত্রিক স্খলনেরদলিলএকজন নারী ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে নিজের গন্তব্যেযাচ্ছিলেনএকই রাস্তায় একটি পিকআপ ভ্যানে করে ডিম নিয়েযাচ্ছিলেন এক চালকসামনের কোনো এক যানজটে পড়ে ভ্যানটিযখনই ওই নারীর হাতের নাগালে এলো, তিনি মুহূর্তের মধ্যে চারপাশদেখে নিয়ে টুপ করে দুটি ডিম হাতিয়ে নিজের ব্যাগে রেখে দেনকোনোদ্বিধা নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই, যেন অতি স্বাভাবিক এক অধিকারতিনি খাটিয়ে নিলেন

মোটা দাগে মনে হতেই পারে, এস আলমের লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংকলোপাট কিংবা শীর্ষ আমলাব্যবসায়ীদের মেগা-দুর্নীতির তুলনায় দুটিডিম হাতিয়ে নেওয়া এমন কী বড় ঘটনা! এই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে এতআদিখ্যেতার কী আছে? কিন্তু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটাই আসলে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাব্যাংকের টাকাচুরি বা রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করার সুযোগ সবার হয় না; তার জন্য একটানির্দিষ্ট ক্ষমতার স্তরে পৌঁছাতে হয়, লবিং করতে হয়, প্রভাবশালী হতেহয়কিন্তু এই যে জ্যামে আটকে থাকা ভ্যান থেকে দুটি ডিম তুলে নেওয়াএটি দেখায় যে, আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের মজ্জায় মজ্জায়এখন সততার অভাবসুযোগের অভাবে আমরা অনেকেই হয়তো সাধুসেজে বসে আছি, কিন্তু সামান্যতম সুযোগ পেলেই নিজের নৈতিকতাবিসর্জন দিতে আমাদের এক সেকেন্ডও সময় লাগে নাএই নারীরক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে আসলে আমাদের পুরো জাতিরাষ্ট্রের চারিত্রিকস্খলন নগ্নরূপে ধরা পড়েছেআমরা আসলে প্রায় সবাই এখন এমনহয়ে গেছি

শৈশবের হারিয়ে যাওয়া পাঠআধুনিক শিক্ষার অন্তঃসারশূন্যতা:প্রশ্ন জাগে, আমাদের এই সামগ্রিক পতন কেন হলো? আমাদেরশিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার আর সমাজ কি তবে পুরোপুরি ব্যর্থ? শৈশবেআমরা যে পাঠ্যবই পড়ে বড় হয়েছি, সেখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় কিছুচিরন্তন সত্যমূল্যবোধ শেখানো হতোঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বামদনমোহন তর্কালঙ্কারের সেইসব অমর বাণী: “পরের হিত চিন্তাকরিবে“, “অন্যের অনিষ্ট করিবে না“, “সদা সত্য কথা বলিবে“, “মিথ্যাবলা মহাপাপ“, কিংবাঅকারণে গাছের পাতা ছিড়িবে না“। এইআপ্তবাক্যগুলো শুধু পরীক্ষার খাতায় লিখে নম্বর পাওয়ার জন্য ছিলনা; এগুলো ছিল একজন মানুষের মানবিকনৈতিক ভিত্তি গড়েতোলার হাতিয়ার

কিন্তু আজ আমাদের শিক্ষকরা কি আর এসব শেখান? নাকিশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবল জিপিএ-৫, সার্টিফিকেট আরকর্পোরেট বাজারের জন্য রোবট তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে? এখনকার জিপিএ-৫ পাওয়া মেধারী সন্তানটি যখন বড় হয়ে রাষ্ট্রেরকোনো বড় পদে বসে প্রথম সুযোগেই ঘুষ খাওয়া শুরু করে, তখন বুঝতেহবে তার শৈশবের শিক্ষার বুনিয়াদেই গলদ ছিলআমরা তাকেপরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিখিয়েছি, কিন্তু মানুষ হওয়া শেখাইনি

কাঠামোগত উন্নয়ন বনাম মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়: আজ আমাদের দেশেজেলায় জেলায় এত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা গড়ে উঠেছেগ্রামীণ পর্যায়েও শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দাবি করা হচ্ছেপাড়ায়পাড়ায় ঝাঁ-চকচকে আধুনিক মসজিদউপাসনালয় তৈরি হচ্ছেআরঅন্যদিকে, ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউবফেসবুক জুড়ে হাজারোমোটিভেশনাল স্পিকার, ধর্মীয় বক্তাসুশীলদের বয়ানের খই ফুটছেপ্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞান, উপদেশ এবং তত্ত্বের কোনো অভাব নেইআমাদেরকিন্তু সবচেয়ে বড়রূঢ় প্রশ্ন হলোসেসবের শিক্ষা আসলেকোথায় যায়?

যদি প্রতিটা গলিতে একটা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয় থাকারপরেও মানুষের অবচেতন মন থেকে চুরির প্রবণতা, পরশ্রীকাতরতা, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা না করে নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি এবংঅনৈতিকতা দূর না হয়, তবে বুঝতে হবে এই বিশাল কাঠামোগতঅবকাঠামোগত উন্নয়ন আসলে অন্তঃসারশূন্যশিক্ষা কেবল মাথায়তথ্যের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে এবং ডিগ্রি দিচ্ছে, কিন্তু মানুষের মনমননকে স্পর্শ করতে পারছে নাআমাদের সংস্কৃতি হয়ে পড়েছে কেবলউৎসব-কেন্দ্রিকচটকদার; জীবনের গভীরে, প্রতিদিনের আচরণে তারকোনো শিকড় বা প্রভাব নেই

ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তঘুণপোকার বিস্তার: আমরা এখন বাস করছিএক অদ্ভুত গোলকধাঁধায়আমাদের বুদ্ধিজীবী, সমাজচিন্তক, রাজনৈতিক কর্মী এবং আমজনতার সিংহভাগই ব্যস্ত ইতিহাস চর্চারচুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়েকে কোন পক্ষের আর কে বিপক্ষের, কার আদর্শখাঁটি আর কারটা ভেজাল, কোন দল স্বাধীনতার স্বপক্ষের আর কেবিপক্ষেরএই রাজনৈতিকআদর্শিক দলবাজি ঠিক রাখতেইআমাদের সব মেধাশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছেইতিহাস অবশ্যইগুরুত্বপূর্ণ, কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের জন্য ইতিহাস জানাআবশ্যককিন্তু বর্তমান যখন চোখের সামনে ধসে পড়ছে, তখন কেবলঅতীত নিয়ে অন্তহীন কামড়াকামড়ি করা এক ধরনের পলায়নপরতাএবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব

আমরা যখন ওপরের স্তরে পক্ষ-বিপক্ষের অবিনাশী লড়াইয়ে মত্ত, তখনআমাদের সমাজরাষ্ট্রের একদম তলদেশ দিয়ে ঘুণপোকা ঢুকে সবকিছুকেটে কুটি কুটি করে দিয়ে যাচ্ছেসেই খবর কেউ রাখছি নাশিক্ষাসংস্কৃতির এই যে মৌলিক গলদ, যা প্রতিদিন একজন সাধারণনাগরিককে চোর বা দুর্নীতিবাজ বানিয়ে তুলছে, এর মূল উৎস কোথায়, তা কেউ তলিয়ে দেখছে নাআমরা উপরিভাগের ডালপালা ছাঁটতেব্যস্ত, অথচ গাছের গোড়ায় যে মড়ক লেগেছে, সেদিকে কারও নজর নেই

ক্ষুদ্র অপরাধের বৃহভবিষ্য: একটি রাষ্ট্র তখনই ভেঙে পড়ে না যখনতার অর্থনীতি দুর্বল হয়; রাষ্ট্র তখনই ধ্বংসের মুখে পড়ে যখন তারনাগরিকদের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যায়আজ আমরা যেনষ্টদের অধিকারেরকথা বলছি, সেই নষ্টরা কিন্তু কোনো ভিনগ্রহ থেকেরকেট বা স্পেসশিপে চড়ে আসেনিতারা আমাদের এই সমাজ, আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের এই পারিবারিক বলয় থেকেইতৈরি হয়েছে

আজ যে নারী রিকশায় বসে স্রেফ দুটো ডিম হাতিয়ে নেওয়ার লোভসামলাতে পারলেন না, সুযোগক্ষমতা পেলে তিনি যে ব্যাংকের ভল্টখালি করবেন না, কিংবা কোনো সরকারি প্রজেক্টের কোটি টাকাআত্মসাকরবেন নাতার গ্যারান্টি কে দেবে? একইভাবে, আজক্ষমতার শীর্ষে বসে ারা হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছেন, ারা হয়তো একসময় এই সমাজেরই কোনো এক স্তরে ছোটখাটোনৈতিক স্খলনের মধ্য দিয়ে, পরীক্ষার খাতায় নকল করে কিংবাছোট-খাট কোনো চুরির মাধ্যমে তার অনৈতিকতার হাতেখড়িকরেছিলেনক্ষুদ্র অপরাধের এই ধারাবাহিকতাই একসময় সমাজকে বড়বড় অপরাধীসমাজবিরোধীদের চারণভূমিতে পরিণত করে

উত্তরণের পথআমাদের দায়: তাই সন্তানকে কেবল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস ক্যাডার বানিয়েমানুষের মতো মানুষকরারমেকি স্বপ্ন দেখার আগে আমাদের সমাজকে নতুন করে সাজাতে হবেকেবল কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করা, দামি গাড়ি চড়া বা বড়সামাজিক স্ট্যাটাস অর্জন করাই যদি সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তবে এই সমাজ আরও দ্রুত গতিতে নষ্টদের দখলে চলে যাবেআমাদেরএখন প্রয়োজন এক গভীর, আমূল শিক্ষাগতসাংস্কৃতিক জাগরণএমন এক সামাজিক আন্দোলন, যা মানুষকে অন্যের অধিকারকেসম্মান করতে শেখাবে, যা লোভের চেয়ে আত্মমর্যাদাকে এবং অন্যায়েরপ্রতি আপসহীনতাকে বড় করে দেখতে শেখাবে

ইতিহাসের পোস্টমর্টেমক্ষণস্থায়ী দলবাজির ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরাআমাদের প্রতিদিনের আচরণ, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ক্ষুদ্রতমনৈতিকতার চর্চাকে ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে দেশের ভবিষ্যনিয়েআশাবাদী হওয়ার মতো কোনো আলো আসলেই আর অবশিষ্ট থাকবেনাআমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ পরিবর্তন কোনোউপরিকাঠামোর বিষয় নয়; এর শুরুটা হয় নিজের ভেতরের লোভকেনিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে

উপসংহার অন্তরের আলোপারিবারিক জাগরণ: পরিশেষে বলাযায়, আমাদের চারপাশের এই তীব্র নৈতিক সংকট এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিরগলদ কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের দরকার সামগ্রিক চিন্তা-চেতনারআমূল পরিবর্তন কেবল আইনের কঠোরতা কিংবা কাঠামোগত উন্নয়নদিয়ে একটি ভঙ্গুর জাতিকে টেনে তোলা সম্ভব নয়আমাদের ভেতরকারসুপ্ত চেতনাবোধ, নীতি-নৈতিকতা, মজ্জাগত সততা এবং পারস্পরিকশ্রদ্ধাবোধ যদি নতুন করে জাগরিত না হয়, তবে এই সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রেযে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সারানো সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠবে

আমাদের দৈনন্দিন অস্থিরতা, সীমাহীন লিপ্সা, পরচর্চা আর পরনিন্দারমতো ব্যাধিগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজকে ভেতরে-ভেতরে বিষিয়েতুলছেএই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলোপরিবর্তনের সুঁই-সুতোটা নিজের ঘর থেকে চালানোরাষ্ট্র বা সমাজেরবড় বড় সংস্কারের আশায় বসে না থেকে, ব্যক্তিপারিবারিক পর্যায়েএই মুহূর্তে নীতি-নৈতিকতাকে সবার উপরে স্থান দেওয়া দরকারসন্তানকে জিপিএ-৫ কিংবা লোভনীয় ক্যারিয়ারের মন্ত্র গেঁলানোর আগেমানুষের মতো মানুষহওয়ার পাঠ দিতে হবে; শেখাতে হবে অন্যেরঅধিকারের প্রতি সম্মানবোধনতুবা এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজকেকোনোভাবেই পাল্টানো যাবে নাএই মহাসংকটে দাঁড়িয়ে আমাদেরমনস্তাত্ত্বিকপারিবারিক স্তরে নিজেদের নৈতিক পরিবর্তনটি আনাইএখন সবচেয়ে বেশি জরুরি

নিকোলাস বিশ্বাস একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং ²জাতিসংঘজনসংখ্যা তহবিল² মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তযোগাযোগ:gonomaddyom@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *