“অতল জলে জলাঞ্জলী“
পর্ব-৮
উপন্যাসিকঃ এ কে সরকার শাওন
–সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া–
বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন তাঁর গতির তৃতীয় সূত্র বলেছেন যে, “প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে”। বিষয়টি শুধু বস্তুর উপর নয় মানুষের মনের উপরও সমানতালে প্রযোজ্য। কোন মানুষকে দেখে ভেংচি কাটলে সেও কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাঁধ্য। শুধু মানুষ নয় বন্য প্রাণীও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। গাছের ডাল পাতা কাটলে গাছ কান্না করে। সেই কান্নার শব্দ তরঙ্গ আমাদের কান শোনার জন্য প্রযোজ্য নয়।
সেদিনের জুহিদের বাড়ীতে এক কথায় প্রকাশ করার বিষয়টি এবং পরদিন বিকেলে ইবলিশ চত্বরের ঘটনাটি জগলু ও জুহি দু’জনার মনেই প্রভাব ফেলেছে। জিল্লুর তার গ্রামের বাড়ী গেছে আজ ছয় সাত দিন হলো। ওর মায়ের অসুখ। জিল্লুর থাকলে মনের কথাগুলো ভাগ করা যেতো। মনের কথা ভাগ করা গেলে মনের দুঃখ লাঘব হয়।
মধ্য ফাল্গুনের আলো ঝলমলে সকাল। আজ শুক্রবার। জগলু তাই অলস শুয়ে আছে। কোন কবিতাও লিখতে পারছে না। আসলে লিখালিখির জন্য মনের সুস্থতা দরকার। অসুখী, উত্তপ্ত ও বিক্ষুব্ধ মন নিয়ে আর যা-ই চলে সাহিত্য চর্চা চলে না। জগলু বিছানা থেকে ওঠে রাতে ভেজানো নরম ছোলা একট টুকরো গুড় দিয়ে খেয়ে এক গ্লাস ইসুপ গুলের ভুসি পান করে আবার বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়লো। মশারীর ভিতরে হাতল ভাঙ্গা চায়ের পেয়ালাটি নিলো। শুয়ে একটি ধূমপান দণ্ড ধরালো। দরজা জানালা বন্ধ থাকায় কক্ষ ও মশারীর ভিতরটা কুয়াশার মত ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে গেলো। জিল্লুর এসে চুপচাপ জগলুর কর্মকান্ড দেখে মিনিটখানেক থ হয়ে রইলো। সে প্রজ্বলিত ধূমপান দণ্ডের ধোঁয়া সে সহ্য করতে পারে না। হঠাৎ কাশি চলে আসায় জগলুর ভাবনার রাজ্য ছেদ পড়লো।
জগলুঃ কী রে তুই কখন এলি?
জিল্লুরঃ মিনিট খানেক আগে। তোর ধোঁয়ার রাজ্যে আমি এক মিনিট টিকলাম না। এর মাঝে তোর কক্ষ সংগী কবীর কী করে থাকে তোর সাথে বলতো?
জগলুঃ শিষ্য বানিয়ে ফেলেছি। আগে শখ করে টানতো। এখন কিনে এনে পান করায়।
জিল্লুরঃ বাহ বাহ বাহ তোর তো সোনায় সোহাগা।
ওঠ! এক্ষুনি ওঠ বলছি। বেলা বাজে পৌঁনে বারটা!
বাবু এখনো বিছানায়!
জগলুঃ তুই দরজা জানলা খুলে বস একটু। আগে বল খালাম্মার শরীর কেমন?
জিল্লুরঃ এখন বেশ ভালো।
এই কথা বলে জিল্লুর নিজেই মশারী টেনে খুলে ফেললো।
-ওঠ! ওঠ!
জগলুঃ তাহলে এই সাতদিন তুই নাটোরের জঙ্গলেই ছিলি?
জগলুঃ আমাদের গাঁয়ের নাম জঙ্গল নয় জংলী।
জিল্লুরঃ জংলীরা কোথায় থাকে?
জিল্লুর কৃত্রিম রেগে বললো
-দেবো শালা গালে এক থাপ্পড় কষে!
জগলুঃ হুম সেটা-ই দে। দেহ আঘতপ্রাপ্ত হলে মনের ব্যথা লাঘব হয়।
জিল্লুরঃ মানে?
জগলুঃ মানে বলছি। আগে চল বাহিরে গিয়ে কিছু খাই।
জিল্লুরঃ এখন এই অসময়ে কী খাবি?
জগলুঃ বাসি ভাত, ঠান্ডা খিচুড়ি, পোড়া রুটি, পুঁতানো সিঙ্গারা সামনে যা পাই তাই খাবো।
ওরা নীচে নেমে একটা রিক্সায় চেপে বিনোদপুর ফটকের বাহিরে একটি ভোজনালয়ে ঢুকলো।
একজন বেয়ারা এসে জানতে চাইলো
-কি খাবেন?
জগলু জিজ্ঞেস করলো
-ভাত হবে?
বেয়ারাঃ হবে, সাথে কী খাবেন?
জগলুঃ কি কি আছে?
বেয়ারাঃ কৈ, কেঁচকি, কাইক্কা, গুতুম, গরু, মুরগী, ডিম, করল্লা ভাজি, মসুর ডাল।
জগলুঃ আমাদের দু’জনকে কাইক্কা মাছ, করল্লা ভাজি ও ডাল দিয়ে ভাত দাও।
জিল্লুরঃ না না না আমি এখন খাবো না। শুধু একজনের জন্য নিয়ে এসো।
জগলুঃ তুই তাহলে চা নে?
বেয়ারাঃ চা হইবো না?
জগলুঃ চা না হলে একটা কোমল পানীয় দাও
বেয়ারাঃ আচ্ছা দিতাছি।
খাবার ও পানীয় আসলো। ভাত মাখতে মাখতে জগলু বললো।
জগলুঃ জিল্লু, সেই দিনগুলোর পর আমার নিজেকে কেমন জানি অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে।
জিল্লুরঃ কোন বিষয়টি ?
জগলুঃ তোর বোন জুহির অপমানিত হওয়াটা।
জিল্লুরঃ ঢিলটা ছোড়ার আগেই বিষয়টি ভাবা উচিত ছিলো। জুহি এখনো অপরিপক্ক। সাথে তুই ও।
জগলুঃ কিন্ত দ্বিতীয় দিনেরটার জন্যও কি আমি দায়ী?
মোটেই না। ওটা প্রথম দিনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া। তুই যা সব সময় বলিস। নিউটনের সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া মতবাদ এখানে হুবহু ফলে গেছে। প্রথম দিন তুই নিজের জ্ঞান জাহির করেছিস। দ্বিতীয় দিন জুহি জাহির করতে চেয়েছিলো। দীনা তোর ছাত্রী হওয়াতে বিষয়টি জুহির জন্য বুমেরাং হলো।
জগলুঃ দীনা খুব ভালো ছাত্রী।
জিল্লুরঃ হুম শুনলাম। বাদ দে ওসব। মোট ক’দিন পড়িয়েছিস মিহিকে?
জগলুঃ চারদিন হবে।
জিল্লুরঃ ছাত্রী হিসাবে মিহিকে কেমন মনে হয়।
জগলুঃ ও চেষ্টা করলে পারে। ভীষণ খামখেয়ালী।
জিল্লুরঃ জুহির সাথে দেখা হয় নি?
জগলুঃ না, সে না কী থ মেরে গেছে। কথাবার্তা খুব কম বলে। বাহিরেও বেশী যায় না।
জিল্লুরঃ কে বললো তোকে?
জগলুঃ মিহি
জিল্লুরঃ মিহি তোকে এগুলো বলে?
জগলুঃ মিহি তো সহজ সরল মেয়ে।
জিল্লুরঃ আর জুহি?
জগলুঃ মনে হচ্ছে জুহির গরলতা গলে তরল হচ্ছে। তুই যা না আজ দোস্ত জুহিকে একটু স্বাভাবিক করতে।
জিল্লুরঃ বোন আমার আর দরদ দেখছি তোর!
জগলুঃ বিষয়টি তা না, সম্পর্কটা সহজ হোক সেটা বলছি।
জিল্লুরঃ আচ্ছা আজ যাবো। এমনিতেই বাড়ী থেকে এলে সেদিনই ফুফুর কাছে যাই।
জগলুঃ পানীয় শেষ কর।
জিল্লুরঃ আর পান করবো না। চল উঠি। তোর সাথে দেখা হবে পরশু ক্লাসে।
জগলুঃ কেন কাল কি করবি?
জিল্লুরঃ একটু পরে ফুফুর ওখানে যাবো। সন্ধ্যায় আবার বাড়ি যেতে হবে।
জগলুঃ বাড়ীতে ঘন ঘন যাচ্ছিস!
বাবার একমাত্র ছেলে তুমি। তুমি বুঝবে না খোকা, বড় ছেলের কতো জ্বালা। মায়ের জন্য চিকিৎসক এমন একটা খাদ্যপ্রাণ লিখেছে যা নাটোরে পাচ্ছি না। ওটা কিনে নিয়ে যাবো।
সামনে একটি রিক্সা এলে জিল্লুর এক লাফে উঠে পড়লো
-এই চলো জোহা ছাত্রাবাসে। তুইও ওঠ, আমি লতিফের সামনে নেমে যাবো।
পর্ব-৭ম https://kalersongbad.com/জাতীয়/পর্ব-৭ম-অতল-জলে-জলাঞ্জলী/