বিশেষ প্রতিবেদন : সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান -স্লোগানকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উপলক্ষে (২৩ জুন ২০২৬ ইং) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
পলাশী দিবস উদযাপন পরিষদের সমন্বয়ে ১৯ টি সংগঠনের একত্রিত আয়োজনে “আর নয় পলাশী : চাই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি” বিষয়ক সেমিনারে গর্জে ওঠে চট্টলাবাসি।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবাধিকার গবেষক অ্যাডভোকেট এ এম জিয়া হাবীব আহসান। সেমিনার উদ্বোধন করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ্’র ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রজন্ম আব্বাসউদ্দৌলা বলেন,
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সম্মানিত উপস্থিতবৃন্দ, আসসালামু আলাইকুম।
আল্লাহ ও আহলে বাইতকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ইসলামের জন্য জীবন দানকারী কারবালার প্রত্যেক শহীদ বীরকে।
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বাংলা ও বাংলাদেশের জন্য জীবন দানকারী প্রত্যেক শহীদ বীরকে।
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের নিপীড়িত মজলুমদের কণ্ঠস্বর শাহিদ রাহবার আয়তুল্লা আলী খামেনি সহ ইরানের সকল শহীদ বীরদের।
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ইরানের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর শহীদ বীরদের।
২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের মাধ্যমেই শুরু হয় প্রায় দুইশো বছরের ব্রিটিশ শাসন। ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়কে স্মরণ করতেই আমরা আজ এখানে জড়ো হয়েছি।
আমি কেবল পলাশীর কথা বলব না, বলব দুটি ইতিহাসের কথা—একটি কারবালার করুণ ঘটনা, অন্যটি আমাদের পলাশীর বেদনা। এই দুটি ঘটনার মধ্যেই আছে বিশ্বাসঘাতকতা, আছে আত্মত্যাগ, আর আছে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর অমর শিক্ষা।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির ৬১ হিজরির ১০ মহররম। ইরাকের কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে ঘটে যায় ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। ইসলামের নবী মুহাম্মদের (সাঃ) নাতি হুসাইন ইবনে আলী (আঃ) মাত্র বাহাত্তরজন পরিবার-পরিজন ও সমর্থককে নিয়ে উমাইয়া শাসকের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। পানি ও খাবারের অভাব, শত্রুর অগণিত সৈন্য, নিজ সন্তানের নিথর দেহ—তবুও হুসাইন সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।
তিনি জানতেন, আত্মসমর্পণ করলে হয়তো প্রাণ বাঁচত, কিন্তু তিনি বেঁছে নিলেন বেঁছে নিলেন আত্মসম্মানকে। হুসাইনকে যারা রক্তাক্ত করেছে তা উম্মতের বিশ্বাসঘাতকতারই ফল। কারবালা শুধু একটি যুদ্ধ নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, সত্যের পক্ষে আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
মহররম আমাদের শেখায়—সত্যের পথ কঠিন, কিন্তু সেই পথই একমাত্র পথ।
এবার আসি আমাদের বাংলার ইতিহাসের কথা।
১৭৫৭ সালের এই দিনে নদিয়া জেলার পলাশীর প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যবাহিনী ছিল প্রায় ৫০ হাজার। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী ছিল হাতেগোনা মাত্র কয়েক হাজার। সংখ্যায় নবাবের সৈন্যসংখ্যা ছিলো বিশাল।
কিন্তু যুদ্ধ জয়ের জন্য শুধু সংখ্যা যথেষ্ট নয়, দরকার সততা ও দেশপ্রেম। আর সেটাই ছিল না।
নবাবের নিজ সেনাপতি মীর জাফর, রাজা রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ—এরা সবাই ব্রিটিশদের সাথে গোপনে নবাবের বিরুদ্ধে বাংলার ক্ষমতার লোভে চক্রান্ত করেছিলেন। যুদ্ধের মাঠে নবাবের অনেক সৈন্য যুদ্ধই করেনি। নবাবের বিশ্বস্ত সৈন্য মীর মর্দান, মোহনলাল যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের কারণে সব শেষ হয়ে যায়।
এভাবেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত করা হয়। বাংলা হারায় তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব।
প্রিয় সুধী, কারবালা আর পলাশী—দুটি ভিন্ন ঘটনা, দুটি ভিন্ন সময় ও স্থানের, কিন্তু এর শিক্ষা কিন্তু এক।
কারবালায় ইমাম হুসাইন (আঃ) ছিলেন সংখ্যায় কম, কিন্তু তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ও ইসলাম রক্ষায় অবিচল। পলাশীতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন সৎ ও দেশপ্রেমিক, কিন্তু তাঁর চারপাশে ছিল সব বিশ্বাসঘাতক।
একটি ঘটনা আমাদের শেখায়—সত্যের পথে আত্মত্যাগ করতে হয়, কিন্তু সেই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। অন্যটি শেখায়—বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করতে পারে।
আমরা যদি সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারতাম, যদি আমরা এক হতে পারতাম, যদি আমরা আমাদের নিজেদের চারপাশের মীর জাফর, রাজবল্লভদের চিনতে পারতাম—তাহলে হয়তো আজ ইতিহাস অন্যরকম হতো।
আজ পলাশী দিবস। এই দিনটি শুধু শোকের দিন নয়, এটি আমাদের জন্য স্মারক দিন—স্মারক সেই বিশ্বাসঘাতকতার, যা একটি জাতিকে দুইশো বছর পরাধীন করে রেখেছিল। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐক্য, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম ছাড়া কোনো জাতি টিকতে পারে না, আর বিশ্বাসঘাতকতা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
কারবালার চেতনা যেমন আমাদের সত্যের পথে চলতে শেখায়, পলাশীর ইতিহাসও আমাদের শেখায়—আমাদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ না ঘটাতে, ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় না দিতে, এবং আমাদের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে।
আমরা যেন ইতিহাসের এই শিক্ষাগুলো মনে রাখি। আমরা যেন নবাবের মতো একা হয়ে না পড়ি। আমরা যেন হুসাইনের মতো সত্যের জন্যে দাঁড়াতে পারি। আর আমরা যেন কখনোই পলাশীর মতো বিশ্বাসঘাতকতার শিকার না হই”।
ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগং-এর ক্যাম্পাস কো-অর্ডিনিটর মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দীনের সঞ্চালনায় প্রবন্ধের আলোকে আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ। উক্ত অনুষ্ঠানে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন, ইসলামী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকার কর্মী মাওলানা মুহাম্মদ করীম উদ্দীন নূরি।
উল্লেখ্য, ইরানি বংশোদ্ভূত চট্টলার একসময়ের তুখোর ছাত্রনেতা আলী মুনির খোরাসানী সাহেবের বিশেষ নিমন্ত্রণে সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা ( নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম বংশধর, সম্পাদক- সাপ্তাহিক পলাশী, চেয়ারম্যান- নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্বাধীনতা পরিষদ ) সাম্প্রতি তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে চট্টগ্রামে এসেছিলেন।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খোরাসানী পরিবারের প্রতি ( জনাব আলী মুনির খোরাসানী,জুনিয়র আলী মোকাররিম খোরাসানী,জুনিয়র নওরোজি খোরাসানী, মিসেস নাজনীন সুলতানা খোরাসানী,আলী রুম্মান ) নবাব প্রজন্ম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।