যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইসের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন বিক্ষোভ

হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রতিনিধি আমেরিকা : মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শুক্রবার ছড়িয়ে পড়ে নজিরবিহীন ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) বিরোধী বিক্ষোভ। ফেডারেল অভিবাসন সংস্থা আইস এর অভিযান বন্ধ এবং মিনেসোটা থেকে ফেডারেল এজেন্ট প্রত্যাহারের দাবিতে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামেন। চলতি মাসে ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টদের গুলিতে দুই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর এই ক্ষোভ আরও তীব্র আকার নেয়।

৩০ জানুয়ারি (শুক্রবার) মিনিয়াপোলিসের ডাউনটাউনে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন। বিক্ষোভে অংশ নেন শিশুদের নিয়ে পরিবার, প্রবীণ দম্পতি, কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং নাগরিক অধিকারকর্মীরা। অনেকের হাতে ছিল “No ICE ”, “Stop the Raids” এবং “End Federal Brutality” লেখা প্ল্যাকার্ড। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভারী অস্ত্রধারী ও মুখোশ পরা ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতি শহরকে কার্যত সামরিক অঞ্চলে পরিণত করেছে।

জাতীয় পর্যায়ে অভিবাসন দমন অভিযানের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিনিয়াপোলিস এলাকায় ৩ হাজার ফেডারেল কর্মকর্তা মোতায়েন করেছেন। এই সংখ্যা মিনিয়াপোলিস পুলিশ বিভাগের মোট সদস্যসংখ্যার প্রায় পাঁচ গুণ। ট্যাকটিক্যাল গিয়ারে সজ্জিত এজেন্টদের নিয়মিত টহল স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এই অভিযান কেবল অভিবাসীদের নয়, বরং পুরো শহরের নাগরিক স্বাধীনতাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ক্যাটিয়া কাগান বলেন, তাঁর বাবা–মা রুশ ইহুদি হিসেবে নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তাঁর ভাষায়, “আমি এখানে দাঁড়িয়েছি সেই আমেরিকান স্বপ্নের জন্য, যেটার খোঁজে আমার পরিবার এই দেশে এসেছিল।” আর ৬৫ বছর বয়সী ধ্যান–শিক্ষক কিম এই অভিযানকে নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের “পূর্ণমাত্রার ফ্যাসিবাদী আক্রমণ” বলে আখ্যা দেন।

এই আন্দোলন কেবল মিনেসোটায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘জাতীয় প্রতিবাদ দিবস’ ঘোষণা করে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ক্লাস বর্জন করেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৬টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২৫০টি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও ওয়াশিংটনের মতো বড় শহরগুলোতে “No work. No school. No shopping. Stop funding ICE” স্লোগানে কর্মসূচি পালিত হয়। শিকাগোর ডি–পল ইউনিভার্সিটিতে “sanctuary campus” ও “fascists not welcome here” লেখা পোস্টার দেখা যায়।

মিনিয়াপোলিসের যে এলাকায় নিহত অ্যালেক্স প্রেট্টি ও রেনি গুড–এর ওপর গুলি চালানো হয়েছিল, সেই পাড়ায় স্থানীয় স্কুলগুলোর প্রায় ৫০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী মিছিল করেন। তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় এই ধরনের অভিযানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আন্দোলনে সংহতি জানাতে এগিয়ে আসেন সংগীতজগতের তারকারাও। কিংবদন্তি রক সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন মিনিয়াপোলিসে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাঁর নতুন গান “Streets of Minneapolis” পরিবেশন করেন। এই গান দ্রুতই বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়।

এদিকে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে মিশ্র বার্তা আসছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, পরিস্থিতি কিছুটা “ডি–এস্কেলেট” করা যেতে পারে, অন্যদিকে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে অভিযান প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। তিনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম–এর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, তিনি “খুব ভালো কাজ করছেন” এবং সীমান্ত সংকট ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

মিনিয়াপোলিসের ঘটনাপ্রবাহ ফেডারেল প্রশাসনের ভেতরেও আলোড়ন তোলে। মিনিয়াপোলিস এফবিআই ফিল্ড অফিসের ভারপ্রাপ্ত প্রধান জ্যারাড স্মিথ–কে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে ওয়াশিংটনে পুনর্বিন্যাস করা হয়। একই সময়ে একটি চার্চে বিক্ষোভের ঘটনায় সাবেক সিএনএন উপস্থাপক ডন লেমনকে গ্রেপ্তার করে ফেডারেল আইনে অভিযোগ আনা হয়। আদালতে হাজির হয়ে লেমন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইস–এর একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকে এজেন্টদের ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। এতে করে নিম্নস্তরের এজেন্টরাও সন্দেহভাজন অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ধরতে ব্যাপক অভিযান চালাতে পারবেন। এই খবর প্রকাশের পর নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় ভারী অস্ত্রধারী ও মুখোশধারী এজেন্টদের আগ্রাসী আচরণের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতি জনসমর্থন তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্তবিষয়ক সমন্বয়কারী টম হোম্যান মিনিয়াপোলিসে গিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে ব্যাপক রাস্তাভিত্তিক ধরপাকড়ের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে ফেরা হবে।

তবে মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট গভর্নর টিম ওয়ালজ এই আশ্বাসে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফেডারেল বাহিনী প্রত্যাহার এবং এই “নিষ্ঠুর অভিযান” পুরোপুরি বন্ধ করাই একমাত্র কার্যকর সমাধান।

এই উত্তাল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। কলোরাডোর অরোরায় এবং অ্যারিজোনার টুসনে ব্যাপক অনুপস্থিতির আশঙ্কায় বহু স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মিনিয়াপোলিস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন আর কেবল একটি অঙ্গরাজ্যের ইস্যু নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি ঘিরে জাতীয় পর্যায়ের এক বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকেতে রূপ নিয়েছে। সূত্র: রয়টার্স ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *