সাইফুল্লাহ নাসির, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি: সড়ক পরিবহন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমতলী–কুয়াকাটা–ঢাকা, পটুয়াখালী ও বরিশাল মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসে অবৈধভাবে মাছ, শুঁটকি, বরফসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে যত্রতত্র বাস থামিয়ে এসব পণ্য ওঠানামা করায় সৃষ্টি হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
বিশেষ করে কুয়াকাটা থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক পণ্য বহনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্থানে বাস থামিয়ে মাছ ও অন্যান্য পণ্য ওঠানো-নামানোর কারণে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় যাত্রাপথে অতিরিক্ত সময় লাগছে। এতে পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে যাত্রীদের অভিযোগ।
বাসের ভেতরে ছড়ায় তীব্র দুর্গন্ধ যাত্রীদের অভিযোগ, বাসের ভেতরে মাছ ও বরফ বহনের কারণে পুরো পরিবেশে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে দুর্গন্ধের মধ্যে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেক যাত্রী বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক অস্বস্তিতে পড়েন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
শুধু তাই নয়, বাসের ছাদে বা অন্যান্য স্থানে রাখা মাছ থেকে বের হওয়া নোংরা পানি ও রক্ত অনেক সময় যাত্রীদের ব্যাগ, পোশাক ও মূল্যবান মালামালের ওপর পড়ে সেগুলো নষ্ট করে দেয় বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
যত্রতত্র পণ্য ওঠানামায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যান্ড বা নিরাপদ স্থানে না থেমে মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় বাস থামিয়ে মাছ ও অন্যান্য পণ্য ওঠানো-নামানো হয়। এতে মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং পেছন থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কারণে নির্ধারিত সময়েও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে চাকরি, ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা পরবর্তী পরিবহন ধরার ক্ষেত্রে যাত্রীরা নানা সমস্যায় পড়েন।
পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
কুয়াকাটা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। পায়রা বন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কটকা, লাল কাঁকড়ার চর, ফাতরার চর, মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে ফেরার সময় পর্যটকদের একটি অংশকে এসব ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পর্যটকদের মতে, একটি দীর্ঘ যাত্রায় যখন বাসের ভেতরে তীব্র দুর্গন্ধ, অস্বস্তিকর পরিবেশ এবং দীর্ঘ বিলম্বের সম্মুখীন হতে হয়, তখন পুরো ভ্রমণের আনন্দই ম্লান হয়ে যায়। এতে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘
বিট মানি’ দেওয়ার অভিযোগ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাসচালক দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী কিছু বাস বিভিন্ন এলাকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নিয়মিত ‘বিট মানি’ দিয়ে থাকে। তার দাবি, এ কারণেই অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে মাছসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
বিট মানি’ দেওয়ার অভিযোগ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাসচালক দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী কিছু বাস বিভিন্ন এলাকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নিয়মিত ‘বিট মানি’ দিয়ে থাকে। তার দাবি, এ কারণেই অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে মাছসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
তবে ওই চালকের এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন।
আইনে কী আছে?
সড়ক পরিবহনসংক্রান্ত প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যাত্রীবাহী বাসের নির্ধারিত ব্যবহারের বাইরে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। বিশেষ করে যাত্রীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর, দুর্গন্ধযুক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে এমনভাবে পচনশীল পণ্য পরিবহন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বাসের চালক, মালিক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী জরিমানা, মামলা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। কার্যকর নজরদারির দাবি যাত্রী ও স্থানীয়দের দাবি, যাত্রীবাহী বাসে অবৈধভাবে মাছ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র বাস থামিয়ে পণ্য ওঠানো-নামানোর প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।
তাদের মতে, নিরাপদ ও নির্ধারিত সময়ে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য স্বস্তিদায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় অব্যাহত ভোগান্তির কারণে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন ও যোগাযোগব্যবস্থা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।