বাংলাদেশ সোসাইটির তহবিলে ৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার, আত্মসাতের অভিযোগ নাকচ: ২০ মাসে আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন

হাকিকুল ইসলাম খোকন, আমেরিকা :  যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি এর আর্থিক হিসাব, ব্যয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিয়েছে বর্তমান কার্যকরী পরিষদ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, অর্থ আত্মসাৎ ও ৭ লাখ ২৫ হাজার ডলার অপচয়ের অভিযোগের পক্ষে কোনো ভিত্তি নেই। তাঁদের উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের সময় সোসাইটির নিট আর্থিক স্থিতি ছিল প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার। গত ২০ মাসে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও তহবিল সংগ্রহের পর বর্তমানে ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ জানান, সংগঠনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সেন্টার ক্রয়ের উদ্যোগ, ভবনের বকেয়া ভায়োলেশন জরিমানা, ইফতার মাহফিলের ব্যয় এবং কর্মকর্তাদের নামে ইস্যু করা চেক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে তাঁরা এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট রয়েছে।
৭ লাখ ২৫ হাজার ডলার ব্যয়ের অভিযোগের জবাব
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান কার্যকরী পরিষদের বিরুদ্ধে ৭ লাখ ২৫ হাজার ডলার আত্মসাৎ বা অপচয়ের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। নেতৃবৃন্দের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ মাসে সোসাইটির নিয়মিত পরিচালনা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে মোট ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ৮৬৫ ডলার। তাঁদের দাবি, এসব ব্যয়ের পক্ষে যথাযথ দালিলিক প্রমাণ ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট রয়েছে।

সংগঠনটির নেতারা বলেন, ব্যয়ের হিসাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচির খরচ এবং তহবিলে অবশিষ্ট অর্থ—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যয়ের পরও ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রয়েছে।

তবে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত আর্থিক তথ্যের স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন বা পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ সেন্টার ক্রয়ের ২ লাখ ডলার ফেরত জ্যামাইকা, নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সেন্টার কেনার উদ্যোগ নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ জানান, ভবনটি কেনার জন্য প্রাথমিক চুক্তির আওতায় ২ লাখ ডলার ডিপোজিট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভবনটির কিছু আইনি জটিলতা এবং বিক্রেতার নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে চুক্তিটি বাতিল করা হয়। পরে ডিপোজিটের সম্পূর্ণ ২ লাখ ডলার ফেরত আনা হয়েছে বলে তাঁরা জানান।
তাঁদের বক্তব্য, সম্ভাব্য আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সদস্যদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে এ অর্থ স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়নি; বরং পুরো অর্থ সোসাইটির কাছে ফেরত এসেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

৮২ হাজার ডলারের ভায়োলেশন জরিমানা কমে ৩১ হাজার
বাংলাদেশ সোসাইটির ভবনের ভায়োলেশন ও জরিমানার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। নেতৃবৃন্দ জানান, পূর্ববর্তী কার্যকরী পরিষদের সময় থেকে চলে আসা প্রায় ৮২ হাজার ডলারের জরিমানা নিষ্পত্তির জন্য একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তাঁদের দাবি, ইতিমধ্যে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার ডলারে আনা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ আরও কমানো বা মওকুফের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে সোসাইটির আর্থিক দায় আরও কমবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

আটটি ইফতার মাহফিলে ব্যয় ৮৯ হাজার ডলার গত দুই বছরে সোসাইটির উদ্যোগে চারটি অঞ্চলে মোট আটটি ইফতার মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এসব অনুষ্ঠানে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৯ হাজার ডলার। এর মধ্যে স্পন্সর ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৪২ হাজার ৭৭০ ডলার।

নেতৃবৃন্দের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, স্পন্সরদের অনুদান বাদ দেওয়ার পর সোসাইটির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৪৬ হাজার ৪৩০ ডলার। অর্থাৎ প্রতিটি ইফতার মাহফিলে সোসাইটির নিজস্ব তহবিল থেকে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৮০৩ ডলার ৭৫ সেন্ট।

তাঁরা বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসব আয়োজন করা হয়। স্পন্সর ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় কর্মসূচিগুলোর ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয়েছে।

কর্মকর্তাদের নামে চেক ইস্যু নিয়ে ব্যাখ্যা সোসাইটির কর্মকর্তাদের নামে ইস্যু করা চেক নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ জানান, বিভিন্ন জরুরি কেনাকাটা ও সাংগঠনিক প্রয়োজনে কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত অর্থ অগ্রিম ব্যয় করলে, পরবর্তী সময়ে বৈধ ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে তাঁদের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অর্থ ফেরতের চেককে হিসাবরক্ষণে রিইম্বার্সমেন্ট বলা হয়।

তাঁদের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে অগ্রিম দেওয়া অর্থের বিপরীতে যথাযথ নথিপত্র যাচাই করেই এসব চেক ইস্যু করা হয়েছে। তবে লেনদেনগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও ভাউচার জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে এ বিষয়ে আরও স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

সদস্যসংখ্যা ১৮ হাজার থেকে বেড়ে ৩৫ হাজারের বেশি
সাংগঠনিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে নেতৃবৃন্দ জানান, বর্তমান কার্যকরী পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশ সোসাইটির নিবন্ধিত সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ হাজার। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

তাঁদের মতে, সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি সংগঠনের প্রতি প্রবাসীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের প্রতিফলন। বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় করা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।

বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে সংগঠনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ, সভাপতি ও সেলিম-আলী পরিষদের সভাপতি পদপ্রার্থী আতাউর রহমান সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক ও একই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী মোহাম্মদ আলী বক্তব্য দেন।
তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, যাচাইবিহীন অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্যবদ্ধ এই সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। ব্যক্তিগত বিরোধ বা মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি কেবল একটি সামাজিক সংগঠন নয়, এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্য, পরিচয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তাই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যবৃন্দ , সেলিম-আলী পরিষদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পদপ্রার্থী, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *