বিশ্ব ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢ ২০২৬: আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস : ২৫ জুলাই ২০২৬ বিশ্ব ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢। এরইমধ্যেসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাম্প্রতিক সিসিটিভিভিডিও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ছোট শিশু একটি পুকুরে ডুবন্ত অবস্থায়বাঁচার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে। অপরদিকে, আরেকটি শিশু ঐ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো চিৎকার করছে এবং মরিয়া হয়ে পানিতেবিভিন্ন বস্তু ছুড়ে বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আশে-পাশে বাড়িঘরথাকলেও কেউ সেই আর্তনাদ শুনতে পায়নি। অবশেষে পাশের একটি বাড়িথেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে এসে উদ্ধার করতে এগিয়ে যান। কিন্তু শিশুটির শেষপরিণতি কি হয়েছিল, তা ভিডিওটিতে আর জানা যায়নি।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতারপ্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়, অথচ অধিকাংশঘটনাই সংবাদ শিরোনামে আসে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটিপরিবারের বেদনা। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হওয়া সত্ত্বেওপানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ এখনো সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোরএকটি। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্য আলোচনায়প্রাধান্য পেলেও পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ রয়ে যায় আড়ালে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরমতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি সহজেইপ্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) জরিপ অনুযায়ী, আমাদেরদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বড় একটিঅংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। এসব মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার বরিশাল অঞ্চলে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং মৌসুমি বন্যাপ্রবণ দেশহওয়ায় বাংলাদেশে পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষপানিতে ডুবে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটেনিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এই ঝূঁকি আরোবেড়েছে।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় এই দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয়বেছে নেওয়া হয়। এবারের বিষয় হল: “Unite to Turn the Tide” – অর্থাৎ, আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই। এটি কেবল একটিআন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য নয়; বরং পানির সঙ্গে আমাদের সহাবস্থানকেআরও নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বব্যাপী এ প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণকরে আসুন আমরা প্রতিরোধযোগ্য ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু¢র মিছিল বন্ধ করি এবংনিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ভূমিকার পালন করি।

বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল, হাওর ও পুকুরে সমৃদ্ধ একটি জলভূমির দেশ। পানিআমাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তুপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাবেএই জীবনদায়ী পানিই মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় শোক ও বেদনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিদিনের নীরব ঝুঁকি জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুরঅন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ ঘটনাঘটে বাড়ির কয়েক মিটারের মধ্যেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। অর্থাৎ বিপদ দূরে নয়, পরিবারের কাছেই ওত পেতে থাকে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তা ও মাঠ সাময়িক জলাশয়ে পরিণত হয়। অল্প সময়ের জন্যও কোনো ছোটশিশু নজরদারির বাইরে চলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপূরণীয় দুর্ঘটনাঘটতে পারে। তাই এ সময়টায় সবাইকে বিশেষভাবে সর্তক থাকতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকরা সাধারণতঃ গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে ছোটশিশুরা অরক্ষিত থেকে যায়। মাত্র দুই বা তিন মিনিটের অসতর্কতা একটিপরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে যা তাদের জন্য নিয়ে আসতে পারেগভীর শোক আর কান্না।

পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো এর নীরবতা। সিনেমায়যেমন দেখা যায়, বাস্তবে পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ – বিশেষ করে শিশুরা – সাধারণতঃ হাত নেড়ে বা চিৎকার করে সাহায্য চাইতে পারে না। আশে-পাশেরমানুষের অজান্তেই তারা নীরবে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢কে “নীরব কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্যসংকট“ হিসেবে অভিহিত করেছে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ জুলাইকে সারা বিশ্ব ¢পানিতেডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢ হিসেবে ঘোষণা করে। এ ব্যাপারে বিশ্ব ষ্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে। তাই পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ প্রতিরোধকে কেবল মৌসুমিউদ্যোগ নয়, জাতীয় জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে পরিণত করা উচিৎ।

কেন এই মৃত্যু থামছে না? বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণপরিস্থিতিতে। বাড়ির পাশের পুকুর, রাস্তার ধারের ডোবা কিংবা বৃষ্টির পানিতেভরা গর্ত মুহূর্তেই প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরাস্বভাবতই কৌতূহলী ও চলাফেরায় সক্রিয় হলেও তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারেনা। এ সময় রান্না, কাপড় ধোয়া বা অন্য কোনো কাজে সামান্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেঅভিভাবকের অজান্তেই শিশুটি ঝুঁকির মুখে পড়ে যা পরিবার ও সমাজের জন্যঅপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বেরবৃহত্তম নদীবাহিত দেশগুলোর একটি হওয়ায় এখানে হাজার হাজার নদী, খাল, বিল ও জলাশয় রয়েছে। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘনঘন বন্যা চারপাশেনতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় সৃষ্টি করে ও বিপদ ডেকে আনে। চলতি বছরেরপ্রবল বৃষ্টিপাত এ বিপদকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সহজ ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেইঅসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগপ্রয়োজন। এজন্য নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপর দৃষ্টিপাত করা অতীবজরুরি: —

১. ছোট শিশুদের কখনোই পানির কাছাকাছি একা না রাখা।

২. বাড়ির আশপাশের পুকুর ও ডোবার চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া নির্মাণকরা।

৩. দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক ডে-কেয়ার কেন্দ্রস্থাপন করা।

৪. বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

 ৫. জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধারকৌশল ও কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR)–এর প্রশিক্ষণ দেওয়া।

 বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, এসব উদ্যোগ কার্যকর। সেন্টার ফরইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB) –এর উদ্যোগেপরিচালিত আঁচল (কমিউনিটি শিশুযত্ন মডেল) এবং সুইমসেইফ (SwimSafe) কর্মসূচি শিশুদের পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢র হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সফলহয়েছে। সমাধান আমাদের জানা আছে; এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দেশব্যাপী কার্যকর বাস্তবায়ন। গবেষণালব্ধ ফলাফলগুরুত্বের সাথে কাজে লাগানো উচিৎ।

পানিতে ¢ডুবে মৃত্যু¢ প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগব্যবস্থাপনা – এই চারটি সরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবেগ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্খিত ফল আসবে না।

 সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ বিশ্ব ¢পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস¢ যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা বক্তব্যেরমধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি হতে হবে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশকে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ, গণসচেতনতামূলক প্রচার এবংবিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। পানিতে ডুবে মারাযাওয়া প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ – একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা জাতীয় নেতা – যার স্বপ্ন অকালেই নিভে যায়।

পানিতে ডুবে কোনো শিশুর মৃত্যু কখনোই কাম্য হতে না। সম্মিলিত সামাজিকউদ্যোগ, নিরাপত্তা শিক্ষা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশতার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে এবং এই নীরব সংকট তথা পানিতে ¢ডুবেমৃত্যু¢র অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে। প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য, কোনোঅবস্থাতেই সেই জীবনের মূল্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *