শামীম আখতার (নিজস্ব প্রতিবেদক) যশোরের কেশবপুরে নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েকদিনের অতি বর্ষণ এবং পৌরশহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হরিহর নদের উপচে পড়া পানির কারণে পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামসহ উপজেলার বিভিন্ন নদনদী পলিতে ভরাট হয়ে জোয়ার-ভাটা না থাকায় ১০৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার ৩৮৩০টি পরিবারেরর ৩৯৩২০ জন মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে পানি বন্ধী হয়ে পড়েছেন। এছাড়াও মৎস্য এবং কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমজুররা বেকার হয়ে পড়েছে। তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে মানবতার জীবনযাপন করছে। তবে, জলাবদ্ধতা পরিবারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুর উপজেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ, হরিহর, বুড়িভদ্রা, শ্রী নদী, ভদ্রা নদী। অধিকাংশ নদনদী মৃতপ্রায়। সংস্কারের অভাব এবং নদনদীতে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা না থাকায় উপচে পড়া পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়! উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করে অসংখ্য ঘের মালিকরা অপরিকল্পিত ভেড়ি বাঁধ নির্মাণ এবং মৎস্য ঘেরে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন করার জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আরেক কারণ বলে মনে করেন সচেতন মহল। এ উপজেলার সকল নদনদী পুনরায় খনন এবং দ্রুত পানি অপসারণের জন্য প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণীপেশার জনগণ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, ভারি বর্ষণে উপজেলার ১৪৪টি গ্রামের মধ্যে ১০৪টি গ্রাম জলাবদ্ধতার স্বীকার হয়েছে। এতে উপজেলার ৩৮৩০টি পরিবারের ৩৯৩২০ জন মানুষ পানি বন্ধী হয়ে পড়েছেন।
প্লাবিত গ্রামগুলো হলো:-কেশবপুর পৌরসভার হাবাসপোল, মধ্যকুল, সাহাপাড়া, ভবানীপুর, ভোগতী-নরেন্দ্রপুর, আলতাপোল, বালিয়াডাংগা, ব্রহ্মকাটি গ্রাম। ১নং ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের ত্রিমোহিনী, বরণডালী, চাঁদড়া, মির্জানগর। ২নং সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের কোমরপুর, সাগরদাঁড়ী, ঝিকরা, শেখপুরা, চিংড়া, ধর্মপুর, গোবিন্দপুর, মেহেরপুর, বাঁশবাড়িয়া, রঘুরামপুর, ফতেপুর, কান্তা, বারুইহাটি, বিষ্ণপুর, মির্জাপুর, গোপসেনা। ৩নং মজিদপুর ইউনিয়নের শ্রীফলা, আটন্ডা, লক্ষীনাথকাটি, কুশলদিয়া, মজিদপুর, শিকারপুর, বাগদাহ, মজিদপুর, প্রতাপপুর, পাত্রপাড়া, হিজলতলা, দেউলী, মির্জাপুর, শ্রীরামপুর, বায়সা। ৪নং বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের বিদ্যানন্দকাটি, কালিয়ারই, তেঘরী, খোপদহি, হাড়িয়াঘোপ, বাউশলা, পরচক্রা, হিজলডাংগা, ভবানীপুর। ৫নং মঙ্গলকোট ইউনিয়নের চুয়াডাংগা, ঘাঘা, মাগুরখালী, বড়পাথরা, কন্দর্পপুর। ৬নং কেশবপুর সদর ইউনিয়নের দোরমুটিয়া, নতুন মূলগ্রাম, মূলগ্রাম, মধ্যকুল, রামচন্দ্রপুর, ব্যাসডাঙ্গা, মাগুরাডাঙ্গা, খতিয়াখালী, সুজাপুর, বালিয়াডাঙ্গা, আলতাপোল। ৭নং পাঁজিয়া ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা-মনোহরনগর, পাঘরঘাটা, রাজনগরবাঁকাবর্শি, সাগরদত্তকাটি, হদ, পাজিয়া। ৮নং সুফলাকাটি ইউনিয়নের শানতলা, কালীচরণপুর, কাটাখালী, গৃধরনগর, বেতীখোলা, নারায়নপুর, ডহরী, কাকবান্ধাল, সারুটিয়া কৃষ্ণনগর। ৯নং গৌরিঘোনা ইউনিয়নের বুরুলী, ভেরটী, সারুটিয়া, আগরহাটি, গৌরীঘোনা, সন্ন্যাসগাছা। ১০নং সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া, কড়িয়াখালী, জাহানপুর, কোমরপোল, বেগমপুর। ১১নং হাসানপুর ইউনিয়নের বুড়িহাটি, আওয়ালগাতি, কাবিলপুর, হাসানপুর, কাকিলাখালী, টিটাবাজিতপুর, নেহালপুর, রেজাকাটি, বগা, মহাদেবপুর ও মোমিনপুর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
মৎস্যখাতে ক্ষতির পরিমাণের বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার সজীব সাহা বলেন, উপজেলায় ৩৬৪০টি মৎস্য ঘের এবং ২৪২০টি পুকুর বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। ঘের মালিকদের আনুমানিক ৫২.৫০ হেক্টর জমির চাষকৃত ২০১৫ মেট্রিক টন সাদা মাছ এবং ৮ মেট্রিক টন চিংড়ি মাছ নদী-নালা, খাল-বিলে চলে যাওয়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ছোটখাটো মৎস্য ঘের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তবে, ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে।
কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, উপজেলাব্যাপী রোপা আমন ধান ৩১৭৩ হেক্টর, সবজি ৩০০ হেক্টর, তুলা ৯.৫০ হেক্টর, মরিচ ২১ হেক্টর, কুল বাগান ৬ হেক্টর, হলুদ ৩০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ৬ হেক্টর, আখ ২০ হেক্টর, পান ২৫.৫০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। যার ফলে কৃষিখাতে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষকের ফসলের ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে।
এ ব্যাপারে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ তুহিন হোসেন বলেন, এ উপজেলায় ১০৪টি গ্রাম বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা পরিবারের জন্য ত্রাণ সামগ্রী হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ১ টন চাউল ও নগত অর্থ ও শিশুদের জন্য শিশুখাদ্য প্রদান করা হয়েছে। আগামীতেও প্রশাসনের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং খুব দ্রুত পানি অপসারণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হয়েছে।