ক্ষমতার অন্তরালে কারা? প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে সামরিক-রাজনৈতিক বলয়ের নানা অভিযোগ, উঠছে অর্থ, প্রভাব ও বিদেশি সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

হাকিকুল ইসলাম খোকন, আমেরিকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রকাশ্য কর্মসূচির বাইরে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। সফরসঙ্গীদের তালিকা, সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা, বিদেশে সম্পদ ও ব্যবসা, অনলাইন প্রচারণা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে গোপন যোগাযোগ নিয়ে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহলে।খবর সাইলা আহমেদ লোপার ফেসবুক ।

অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটি গুরুতর। তবে এসবের অনেকগুলোর পক্ষে এখনো প্রকাশ্য, স্বাধীন ও নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব কি নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাস্তব কোনো ক্ষমতার নেটওয়ার্ক?

সফরের চার দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে কারা? প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সফরের চার দিন আগে কর্নেল নাহিদ, এএমএসপিএম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনসহ প্রায় ২৪ জন সংসদ সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা কি প্রধানমন্ত্রীর সফরের সঙ্গে সমন্বিত কোনো কর্মসূচিতে ছিলেন, নাকি প্রত্যেকে আলাদা কর্মসূচিতে গেছেন?

প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সফরসঙ্গী নিয়ে প্রকাশিত সংবাদেও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে সরকারি প্রতিনিধি দল এবং আগে যাওয়া ব্যক্তিদের পৃথক তালিকা প্রকাশ করা হলে এ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।

বিজিবির ডিজিকে ঘিরে যত প্রশ্ন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে।

অভিযোগ রয়েছে, তার পারিবারিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামস এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী সামরিক সচিব কর্নেল নাহিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এমনকি অভিযোগ উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদে তার অবস্থান ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক দায়িত্বে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল সক্রিয়।

এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সামরিক নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ইউটিউবারদের মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে পছন্দের নয় এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে কয়েকজন আলোচিত ইউটিউবার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অভিযোগে ইলিয়াস হোসেন, পিনাকী ভট্টাচার্য ও জুলকারনাইন সায়েরের নাম এসেছে। দাবি করা হচ্ছে, প্রথমে অনলাইনে কোনো কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। পরে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি ব্যক্তিগত বিরোধের চেয়ে অনেক বড় বিষয়। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে অনলাইন প্রচারণার সমন্বিত ব্যবহার হলে তা সামরিক প্রশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দুটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

তবে এমন অভিযোগ প্রমাণের জন্য যোগাযোগের রেকর্ড, ভিডিও প্রকাশের সময়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

উত্তরায় ‘তদবির অফিস’? কর্নেল নাহিদের শ্বশুরকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, সামরিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে উত্তরায় একটি অফিস পরিচালনা করা হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের তদবিরের কাজ করা হয়।

অফিসটির মালিকানা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্ক যাচাই করলে অভিযোগটির বাস্তবতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

বিদেশে সম্পদ, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট বিজিবির ডিজির বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল সম্পদের অভিযোগও সামনে এসেছে।
কানাডায় একটি বড় বাড়ি, সেখানে পরিবারের সদস্যদের বসবাস এবং ঢাকার মাটিকাটা-ইসিবি এলাকায় ‘অনলাইন ২১ টাওয়ার’ নামে একটি প্রকল্পে চারটি ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী এবং তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ আয় ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

এ ক্ষেত্রে ভূমি রেজিস্ট্রি, ফ্ল্যাটের ক্রয় দলিল, আয়কর নথি এবং বিদেশি সম্পদের তথ্যই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

বিজিবির বেকারি থেকে কার বাসায় উপহার আরেকটি অভিযোগ আরও বিস্ময়কর। দাবি করা হচ্ছে, বিজিবির বেকারি থেকে বড় আকারের বিস্কুটের ঝুড়ি বা উপহারের প্যাকেট বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বাসায় নিয়মিত পাঠানো হয়। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে এসব সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এখানে তদন্তের প্রশ্ন খুব সরল: কারা এসব উপহার পেয়েছেন এবং ব্যাংক থেকে কারা ঋণ পেয়েছেন?

আন্তর্জাতিক পদ পাওয়ার চেষ্টা বিজিবির ডিজিকে আন্তর্জাতিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্বে পাঠানোর চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এমনকি ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার পদে তাকে পাঠানোর জন্য সামরিক পর্যায়ে তৎপরতার কথাও বলা হচ্ছে।

তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া এ দাবি নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।

নিরাপত্তা উপদেষ্টার পরিবারের বিদেশি ব্যবসা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টার দুই ছেলে বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছেন এবং এর আগে অস্ট্রেলিয়াতেও গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও দাবি করা হচ্ছে, নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভাই বুলবুলের মাধ্যমে ইতালিতে তিনটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড ৫ আগস্টের পর শুরু হয়েছে।
সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতালির কোম্পানি রেজিস্ট্রি, ব্যবসার মালিকানা, বিনিয়োগের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বিমানবাহিনী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার সম্পর্ক বর্তমান বিমানবাহিনী প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টার প্রতি বিশেষ আনুগত্য দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন আলমগীরকে নিরাপত্তা উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করা হচ্ছে, তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও ভূমিকা রাখছেন। ‘ফ্যালকন ট্রেডার্স’ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে কোম্পানি নিবন্ধন, মালিকানা ও আর্থিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

সামরিক উপদেষ্টার ব্যবসা-বাণিজ্য সাবেক রাশিয়া বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তার নামে নতুন করে ডিজিডিপি লাইসেন্স দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, লাইসেন্সটি কী ধরনের এবং কোন কর্তৃপক্ষ তা দিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক লেনদেনও যাচাই করা প্রয়োজন।

বিটিআরসিকে ব্যবহার করে সংবাদ সরানোর অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো, নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ বিটিআরসির মাধ্যমে অনলাইন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দাবি করা হচ্ছে, বিটিআরসি চেয়ারম্যান জেনারেল বারীর মাধ্যমে এসব কনটেন্ট অপসারণ করা হয়েছে।

এমন ঘটনা সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতার ব্যবহার নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করবে।

কার নির্দেশে কোনো সংবাদ বা অনলাইন কনটেন্ট সরানো হয়েছে, তার লিখিত নথি আছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কানাডা সীমান্তে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাশেদকে আটকের দাবি

আরেকটি চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাশেদকে নিয়ে।

দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাফেলো সীমান্ত দিয়ে কানাডায় প্রবেশের সময় কানাডীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে। তিন দিন আটকে রাখার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।

আরও বলা হচ্ছে, কানাডার কোনো কালো তালিকায় তার নাম রয়েছে এবং বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন নামে অবস্থান করছেন।

এ ধরনের দাবি অত্যন্ত গুরুতর। তাই কানাডীয় ইমিগ্রেশন নথি, সীমান্ত প্রবেশের তথ্য, আদালতের রেকর্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নথি ছাড়া এটিকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে প্রকাশের সুযোগ নেই।

নিউইয়র্কে সাক্ষাতের দাবিও আলোচনায় অভিযোগ রয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে কর্নেল নাহিদের সঙ্গে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাশেদের সাক্ষাৎ হয়েছে।

সাক্ষাতের দাবিটি সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, দুই কর্মকর্তার আলোচনার বিষয় কী ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশি সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের মধ্যে তাদের যোগাযোগের পরিধি কতটা বিস্তৃত।

তবে সাক্ষাতের ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এ দাবিও নিশ্চিত করা যায় না।

পুরো ঘটনাপ্রবাহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এগুলো আলাদা আলাদা অভিযোগ। কিন্তু যদি নথিপত্রে এসব অভিযোগের কিছু অংশও সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক প্রশাসন, ব্যবসা, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে একটি সম্ভাব্য প্রভাববলয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তাই এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নথিভিত্তিক অনুসন্ধান।

কারা প্রধানমন্ত্রীর আগে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন?

তাদের সফরের অর্থায়ন কে করেছে?

সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিদেশি সম্পদের তথ্য কী?

কোন কর্মকর্তা কোন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত?

কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার স্বার্থ রক্ষা হয়েছে?

কোন সংবাদ কেন অপসারণ করা হয়েছে?

কারা ব্যাংকঋণ পেয়েছেন এবং কী প্রক্রিয়ায়?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, আলোচিত অভিযোগগুলো নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা, নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রমাণযোগ্য কোনো ক্ষমতার কাঠামো।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বিষয় নয়। সম্পদ, ক্ষমতার ব্যবহার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতেই দেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *