রায়হান আহমেদ তপাদার, ইংল্যাণ্ড -লেখক, গবেষক ও কলামিষ্ট ঃ বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিল ভারত। তাঁর পতন নয়াদিল্লিকে হতবাক করেছে। তবে ভারত যেহেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশীদার, তাই ঢাকার সঙ্গে তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশকেও ভারতনীতি নতুন করে সাজাতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তন আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন ও মিয়ানমার ঘিরে বাংলাদেশের নীতিতে। গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশের বিভিন্ন মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে দৈন্যদশা সৃষ্টি হয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে নতুন অভিযাত্রার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্য অর্জন বেশ কঠিন। তবে প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলে নানামুখী প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ দ্বন্দ্বের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভারসাম্য সরকার কিভাবে রক্ষা করবে?শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গত ৮ আগস্ট একটি অন্তর্বর্তী সরকার নেতৃত্ব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এই রূপান্তরটি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করে। কারণ নতুন প্রশাসনকে দেশের বৈদেশিক নীতির দিকনির্দেশনায় পরিবর্তনের সম্ভাব্য অভিনেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার স্পষ্ট করেছে যে, তার প্রশাসন পররাষ্ট্রনীতিতে সব দেশের সাথে সমান আচরণ করবে। জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ওপর নির্মাণে জোর দেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই নীতিগত বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগটি কেমন হবে?
৫ সপ্তাহের বেশি সময় পার হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র কৌশল বাস্তবে অবয়ব নিতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারের প্রথম কয়েক সপ্তাহ পার হয় দেশে কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকীকরণে।
এখন সরকারের সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা দুই দফা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। দুইবারই পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ে কম বেশি কথা বলেছেন। তিনি একাধিক বিদেশী মিডিয়ার সাথে সাক্ষাৎকারেও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তবে গত এক সপ্তাহে পররাষ্ট্র কৌশল নির্ধারণে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকান ট্রেজারি বিভাগের ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান-এর নেতৃত্বাধীন আমেরিকান প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। এই টিমে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুও রয়েছেন। প্রতিনিধিদলটি প্রধান উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে পৃথক পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করেছেন। এ ব্যাপারে আমেরিকান প্রতিনিধিদল ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। এর আগের হাসিনা সরকার ‘কারো সাথে বৈরিতা নয় সবার সাথে বন্ধুত্ব’ নীতির কথা বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিকে মূলত ভারত নির্দেশিত নীতিতে পরিণত করেছিল। আর শেখ হাসিনার পলায়নের পর বাংলাদেশে পরিস্থিতি অস্থির করার নানা আয়োজনে প্রতিবেশী দেশটির সক্রিয় প্রভাব লক্ষ করা গেছে। পতিত স্বৈরাচার ভারতে অবস্থান করেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এসব বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের আগ্রাসী নীতি গ্রহণেরই সঙ্কেত। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস তার প্রথম নীতিগত ভাষণে, প্রশাসনের অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরেন।তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সঙ্কটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোও মোকাবেলার কথা বলেন। তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এটি এমন একটি অবস্থান যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি তার প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি জোরদার করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বাংলাদেশের ইতিহাসের এই সঙ্কটময় সময়ের মধ্য দিয়ে প্রফেসর ইউনূস ও তার প্রশাসনের সাথে কাজ করার জন্য তাদের প্রস্তুতির কথা ব্যক্ত করেছেন। মিলার সহিংসতা বন্ধের জন্য প্রফেসর ইউনূসের আহ্বানকে স্বাগত জানান এবং দেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। ইইউর উচ্চ প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্রনীতি প্রধান জোসেফ বোরেল বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সহিংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ থেকে বছরে ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানিকারী ইইউ এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশে সুশাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের উপর জোর দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র মনে হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সহযোগিতা আরো গভীর করার আশা প্রকাশ করে অধ্যাপক ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাব্য উষ্ণতার ইঙ্গিত দেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদির বার্তাটি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় তার দেশের জন্য বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার বিশেষ তাৎপর্য তুলে ধরে। চীন দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব আরো এগিয়ে নিতে একসাথে কাজ করার প্রস্তুতির কথা বলেছে। চীন শেখ হাসিনার সরকারকে সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্ত সবধরনের সহায়তা দিয়ে গেছে; কিন্তু নির্বাচনের পর একান্তভাবে দিল্লি অনুগত মনোভাব বেইজিংকে ত্যক্ত বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন করেছে।
ফলে হাসিনা রক্ষার মিশন বেইজিং পরিত্যাগ করায় দিল্লি একা হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি। চীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে পরবর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়তে চায়। পরবর্তী সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন হবে বলে বেইজিং প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে বিলম্ব বা অন্তর্বর্তী সরকারের বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা বেইজিং পছন্দ করবে বলে মনে হয় না। চীনের জন্য উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো মিয়ানমার সীমান্ত। সেখানে কোনো প্রক্সি যুদ্ধে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়ুক সেটি বেইজিং চায় না। তাদের সংশয় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বার্মা আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ রকম কিছু চাইতে পারে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ ভারত ও চীনসহ প্রধান আঞ্চলিক খেলোয়াড়- দের নৈকট্যের দ্বারা গঠিত। অন্তর্বর্তী সরকারকে দক্ষতার সাথে কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা সংরক্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য এই গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করে এগুতে হবে। রাশিয়ার স্বার্থ বাংলাদেশে খুব বেশি ব্যাপক নয়। তবে রাশিয়া বৈরী হলে তার মূল্য হতে পারে অনেক বড়। রাশিয়া বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে সম্পৃক্ত। এখানে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে তার সবচেয়ে বড় সম্পৃক্ততা। রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, সার ও জ্বালানি পেতে পারে সাশ্রয়ী মূল্যে। প্রধান উপদেষ্টার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ম্যান্টিটস্কি। তিনি রূপপুরের কিস্তি বিলম্বিত করা, সাশ্রয়ী দামে গম সার ও জ্বালানি প্রদানের প্রস্তাব দেন বলে জানা যায়। কিন্তু এরপর রূপপুর প্রকল্পে এবং গ্রাসপ্রমকে দেয়া গ্যাস অনুসন্ধান কাজে দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। আর সে সাথে গ্রাসপ্রমের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়। এতে ক্রেমলিন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ককে বৈরিতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হবে দিল্লির নেতিবাচক কাজের সাথে মস্কোর সম্পৃক্ততাকে যুক্ত করা। রাশিয়ার সাথে বেইজিং কোনো কারণে বিরক্ত হলে শুধু পশ্চিমের সহযোগিতায় অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যের যে কথা প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার নীতি বক্তব্যে বলেছেন তার বাস্তবে প্রতিফলন প্রয়োজন। ইউনূসের সরকার কৌশলগতভাবে পশ্চিমের মিত্র হবে এবং বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সেটির প্রয়োজনও রয়েছে। তবে রাশিয়া বা চীনের সাথে শত্রুতা ডেকে না এনেই সেটি করা সম্ভব। এ ধরনের ভারসাম্য প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান অথবা তুরস্কের মতো ন্যাটো সদস্য দেশ অনুসরণ করে যাচ্ছে। এটি না করতে পারলে বাংলাদেশের সামনে বিপদ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হাসিনা একান্ত দিল্লির অনুগত নীতি নিয়ে সব মিত্রকে হারিয়ে নিজের জন্য সেই বিপদ ডেকে এনেছিলেন। তবে অধ্যাপক ইউনূস নিশ্চয় এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিণামদর্শিতা রাখেন। যদিও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই বড় ধরনের কোনো হুমকির মধ্যে পড়েনি। তারপরও আমার মনে হয়, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। পশ্চিমা দেশগুলো, জাতিসংঘ এবং আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররাও বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জন করার জন্য আরও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে।আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন না ঘটলে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বলি আর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বলি, কোনো লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব হবে না।এ সবকিছু বিবেচনা নিলে দেখা যায়,
বিশ্বরাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটছে এবং নতুন করে অনেক মেরুকরণ হচ্ছে, নতুন নতুন ইস্যু তৈরি হচ্ছে, নতুন নতুন নেতৃত্ব আসছে। এসব পরিস্থিতির বিবেচনায় আমাদের বিদেশনীতিকে সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ একটা সম্ভাবনার দিকে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা একটা চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্যে আছি। বিশ্বরাজনীতিও একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই রূপান্তরের ভেতরে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর করে এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়া আমাদের জন্য খুব জরুরি। আমাদের আগামীর সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই এ বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।