হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রতিনিধি আমেরিকা :
মননে স্বাধীনতা এবং নারী দিবসের মাহাত্ম্য- জাকির হোসেন বাচ্চু
“নারী সে শিখাল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরাল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
অদ্ভূতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে করে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ।”
– কাজী নজরুল ইসলাম (নারী) প্রতি বছর মার্চ মাসের ৮ তারিখে “আন্তর্জাতিক নারী দিবস” পালিত হয়। সমাজে নারীর অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সারা বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে “আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করে এবং তখন থেকেই ৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন শুরু করে। পরে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৮ মার্চকে নারীর অধিকার ও আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুরুটা হয় শ্রমিক আন্দোলন থেকে, যা একসময় জাতিসংঘ স্বীকৃত বাৎসরিক দিবস হয়ে উঠে। আর এসব কিছুর শুরুটা হয় ১৯০৮ সালে, যখন এক সাথে প্রায় ১৫ হাজার নারী নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমে আসে কর্মঘন্টা কমানো, বেতন বৃদ্ধি ও ভোটের অধিকারের দাবিতে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন “আন্তর্জাতিক নারী দিবস” পালিত হয়। এটি এমন একটি দিন যা নারীর জাতীয়, জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তাদেরকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এই দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের চিন্তাটা মাথায় আসে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ও সমাজতান্ত্রিক কর্মী ক্লারা জেটকিনের। তিনি তার এই চিন্তাটা জানান ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে নারী শ্রমিকদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সেখানে ১৭টি দেশের ১০০ জন নারী উপস্থিত ছিলেন, এবং তারা সর্বসম্মতিক্রমে তার এই প্রস্তাব মেনে নেন। রুশ বিপ্লবের নেতা ভ. ই. লেলিন এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।
ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে নরীবাদ শব্দটির প্রচলন হয়। নরীবাদ হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার একটি মতবাদ। নারীবাদ মতাদর্শ হলো নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক লৈঙ্গিক, বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। নারীদের কর্মকাণ্ড- বৃহৎ পরিসরে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত। আন্দোলনকারীরা দৈহিক স্বাধীনতা ও তা রক্ষার অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, প্রজনন অধিকার (জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার, সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণ ও উন্নতমানের প্রসূতি চিকিৎসা লাভের অধিকার।
নারী আর ধর্ম নিয়ে এই পৃথিবীতে যত লেখা হয়েছে, বোধ করি এত লেখা আর কোনো বিষয় নিয়ে হয়নি; যুদ্ধও কম হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীকে মুক্ত করার লড়াই শুরু হয়েছে সেই ১৮৫৭ সালে। পরে সমাজতন্ত্রীরা অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছেন এই আন্দোলনকে। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদযাপিত হলেও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোই মূল লক্ষ্য বলে বিবেচিত।বাংলাদেশে নারীমুক্তি আন্দোলন দৃশ্যত শৌখিন একটি বিষয়। খুব সহজেই নারীমুক্তির কথা বলা যায়; বলাও হচ্ছে খুব! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কে দেখাবে নারীকে মুক্তির পথ, কে দেবে তাদের অধিকার? শাসক শ্রেণির একাংশই কি ধর্ষক ও নারী নির্যাতনকারী নয়? তাদের রক্ষা ও মদদ দিচ্ছে কে? রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন আসলে বলার আর কিছুই থাকে না। এ যেন “যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ” এর মতো। পুরুষতন্ত্রের রক্ষক সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-সামন্তবাদের বিরোধিতা না করে নারীমুক্তি কি সম্ভব?
পুঁজিবাদ অনেক কিছুর মতো নারীকেও পণ্য বানিয়েছে। এরও আগে ধর্ম তাকে বানিয়েছে পুরুষের আনন্দের উপকরণ। প্রায় সব ধর্মগ্রন্থই নির্দেশ দিয়েছে, নারীকে রাখতে হবে ঘরের ভেতর বন্দি। তার কোনো স্বাধীন সত্তা নেই। সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করা, পুরুষকে আনন্দ দেওয়া আর সন্তান লালন-পালন করাই তার একান্ত কর্তব্য।উনিশ শতকের প্রথম থেকেই নারীরা নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করছেন। আন্দোলন- ধর্মঘট চলাকালীন নারীদের ওপর পুলিশের পাশবিক নির্যাতন, গ্রেফতার, জেল ও জরিমানা সত্ত্বেও তারা পিছু হটে না। বরং উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরাও সাহসী শ্রমিকদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। এই ঘটনায় মালিক শ্রেণি ও সরকার চিন্তিত ও সতর্ক হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, সত্যিই সময় এখন নারীদেরই! এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদেই নারীরা অবস্থান করছে। তারা কর্তৃত্ব করেন, ভাষণ দেন, হুকুমের সুরে শাসন করেন। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা কী কমেছে? কমেনি বরং খুন-ধর্ষণ-নির্যাতন বেড়েই চলেছে। শ্রমজীবী নারী তার যথাযোগ্য মজুরি পাচ্ছে না, বখাটে-মাস্তানের ভয়ে নিরাপত্তার অভাবে বাল্যবিবাহ বেড়েই চলেছে, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে, স্বাভাবিক সুস্থ চিন্তা-চেতনা বিকশিত হয় না, কৈশোরের স্বপ্ন আলোর মুখ দেখে না, বয়সের আগেই মা হয়ে যায়, অপুষ্টি আর অবসাদ গ্রাস করে। কোনো এক ধূসর সন্ধ্যায় মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে যায়।
নারীর মধ্যেও শ্রেণিবিভাগ আছে, আছে বৈষম্য। একজন সাধারণ নারী তার স্বামীর নির্যাতন থেকে মুক্তি চায়, শ্রমজীবী নারী চায় তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি। এসব হতদরিদ্র নারী-পুরুষ চায় তাদের বেঁচে থাকার সামান্য উপকরণগুলো সহজলভ্য হোক, আরো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হোক নতুন প্রজন্মের জন্য। অন্যদিকে উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীর সমস্যা ভিন্ন। তাদের অনেকেই পুরুষকে শাসন করে। রোজগার করে কালোটাকা। ভোগ করে। তাদের আছে অবাধ স্বাধীনতা। সমাজে তাদের দায়বদ্ধতা নেই বললেই চলে। বিদ্যমান রাষ্ট্র এ ব্যাপারে উদাসীন।
পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার প্রভৃতি ক্ষেত্রে নারীবাদ গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক ভালো কাজ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে নারীবাদীরা আশানুরূপ সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। নানা নির্যাতন নারীমুক্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। নারী তার ঘরেই বেশি নির্যাতিতা হন। বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ স্বামীর দ্বারা শারীরিক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ।লেখক: জাকির হোসেন বাচ্চু,সাধারণ সম্পাদক, প্রগ্রেসিভ ফোরাম ইউএসএ।