হাকিকুল ইসলাম খোকন, আমেরিকা : শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের বেঁচে থাকা, বিনিময় আর আকাঙ্ক্ষার গল্প বুনে চলেছে একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া—যার আদি উৎস লুকিয়ে আছে লাতিনের প্রাচীন ধুলোবালি মাখা চত্বরে। রোমান সাম্রাজ্যের সেই কোলাহলমুখর বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে তখন বলা হতো Mercatus, ক্লাসিক্যাল কিংবা চার্চের গম্ভীর রীতিতে যার উচ্চারণ ছিল ‘মের্কা-তুস’ (Mer-kah-toos)। এই ‘মের্কা-তুস’-এর গর্ভেই লুকিয়ে ছিল মানুষের আদি কেনাবেচার স্পন্দন। কালের নিয়মে সেই শব্দই ফরাসি রাজপথ ঘুরে, কিছুটা রূপ বদলে ইংরেজিতে এসে থিতু হলো দুটি চেনা রূপে—’Market’ এবং ‘Marketing’।
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘বাজার’ শব্দটি মূলত একটি ফারসি (Persian) শব্দ। মধ্যযুগে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর ও মুঘল আমলে ফার্সি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক ও সামাজিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে এই শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে । বাজার শব্দটির মূল উৎস প্রাচীন পাহলভি (প্রাচীন ফারসি) শব্দ ‘বাহা-চার'(baha-char) থেকে । পাহলভি ভাষায় এর অর্থ ছিল ‘মূল্যের স্থান’ বা ‘দামের জায়গা’ । এই ‘বাহা-চার’ শব্দটি বিবর্তিত হয়ে ফারসি ‘বাজার’ রূপে আত্মপ্রকাশ করে । সুলতানি ও মুঘল শাসনামলে বিপুল সংখ্যক ফারসি শব্দ বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে যুক্ত হয় । সেই সময় পণ্য কেনাবেচার স্থান বোঝাতে দেশি ‘হাট’ বা সংস্কৃত ‘হট্ট’ শব্দের পাশাপাশি ‘বাজার’ বাংলায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। পারস্যের বণিকদের মাধ্যমে এবং ওসমানীয় (অটোমান ) ও মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তরের ফলে এই শব্দটি বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ভাষায় ছড়িয়ে পড়েছে । কোথাও কোথাও শব্দটির হুবহু আবার কোথাও কোথাও সামান্য পরিবর্তিত হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে । ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও আরবিতে ফারসি ভাষার অনুরূপ উচ্চারণেই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। আলবেনিয়া, বসনিয়া, গ্রীক ও ইতালিতে বাজার শব্দটি ব্যবহৃত হয় প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব উচ্চারণ ভঙ্গিতে। তুর্কি ভাষায় বাজারকে ‘পাজার’ (Pazar), আমাদের অতি নিকটবর্তী প্রতিবেশী অসমীয় ভাষায় ‘বজার'(b^ozar) বলা হয় ।
ভাষার এই স্রোতস্বিনী এখানেই থেমে থাকেনি। ইউরোপের বুক চিরে জার্মানি ও স্পেনের মাটিতেও এর নিজস্ব অনুরণন তৈরি হয়েছে। জার্মানরা তাদের সুশৃঙ্খল ঐতিহ্যে বাজারকে ডাকল Markt—যার উচ্চারণ ‘মার্ক্ট’ (এটি একটি পুংলিঙ্গবাচক শব্দ, Der Markt)। আর এই বাজারকে কেন্দ্র করে যে বিপণন প্রক্রিয়া, আধুনিক জার্মান ব্যবসায় তাকে সরাসরি ইংরেজি ধাঁচেই বলা হয় Marketing, যার উচ্চারণ ভারী গলায় শোনায় ‘মার্কেতিং’ (অথবা বিশুদ্ধ জার্মানে এর সমার্থক শব্দ Vermarktung, উচ্চারণ: ‘ফেয়ার-মার্কটুং’)। অন্যদিকে, স্প্যানিশ ভাষার রোমান্টিক আবহাওয়ায় ভৌত বা অর্থনৈতিক বাজার রূপ নিল Mercado-তে, যার উচ্চারণ স্নিগ্ধ কণ্ঠে শোনায় ‘মের্কাদো’ (El mercado); আর তার থেকে জন্ম নেওয়া মার্কেটিং বিদ্যাকে তারা চেনে Mercadotecnia নামে, যার উচ্চারণ তরল ও ছন্দময়—’মের্কাদোতেকনিয়া’ (কিংবা আধুনিক স্প্যানিশে Marketing, উচ্চারণ: ‘মার্কেতিন’)।
এই ভাষাতাত্ত্বিক মানচিত্রটি আরও পূর্ণতা পায় যখন আমরা প্রাচ্যের দুই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতা—আরব ও চীনের দিকে তাকাই। মরুভূমির কাফেলা আর সুপ্রাচীন ব্যবসায়ের ঐতিহ্যবাহী আরবরা বাজারকে চেনে ‘সুক’ নামে, যার উচ্চারণ অত্যন্ত চেনা ও চটপটে—’Souq’। আর এই বাজারকে ঘিরে আধুনিক বিপণন বা মার্কেটিং বিদ্যাকে তারা তাদের ব্যাকরণগত মাধুর্যে নাম দিয়েছে ‘তাসউইক, যার গভীর ও গম্ভীর উচ্চারণ শোনায় ‘Tasweeq’। অন্যদিকে, সুদূর প্রাচ্যের চীনা সভ্যতার চিত্রলিপির জাদুতে বাজার শব্দটিকে ফুটিয়ে তোলা হয় ‘Shìchǎng’ হিসেবে, ম্যান্ডারিন টোনের চড়াই-উতরাইয়ে যার উচ্চারণ শোনায় ‘শি-ছাং’। আর এই বাজারের সাথে যখন বিপণন ও বিজ্ঞাপনের আধুনিক কৌশল যুক্ত হয়, তখন ‘মার্কেটিং’ শব্দটি রূপ নেয় Yíngxiāo রূপে, যার উচ্চারণ এক অদ্ভুত সুরের ব্যঞ্জনা তৈরি করে—’ইং-শিয়াও’।
প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এই বৈশ্বিক শব্দের ঢেউ একসময় এসে আছড়ে পড়ল রূপসী বাংলার পলিমাটিতে। ১৭শ থেকে ২০শ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য আর আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ‘বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’দের হাত ধরে ল্যাটিন ও ফরাসি ভাষা ঘুরে ইংরেজিতে আসা ‘মার্কেটিং’ শব্দটি সরাসরি আমাদের মজ্জায় মিশে গেল। বাংলা ভাষা তার সহজাত অতিথিপরায়ণতায় শব্দ দুটিকে আপন করে নিল। আমরা ছাদযুক্ত বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোকে ‘বাজার’ বা ‘হাটের’ বদলে ডাকতে শুরু করলাম ‘মার্কেটে’ যাব বলে। ব্যাকরণের দিক থেকে ‘মার্কেটিং’ একটি বিশেষ্য পদ (Noun) বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য (Gerund)—যার নিজস্ব কোনো কাল বা Tense নেই, কেবল সাহায্যকারী ক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে সে Present (is marketing), Past (were marketing) বা Future Continuous Tense-এর রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু বাঙালি এই ইংরেজি Noun-এর পেছনেও ‘করা’ যুক্ত করে এক অদ্ভুত যৌগিক ক্রিয়াপদ বানিয়ে নিল—”আমি আজ মার্কেটিং করব।”
অথচ, এই ধার করা শব্দের সমান্তরালে বাংলা ভাষার নিজস্ব গভীরে জন্ম নিয়েছিল এক রাজকীয় তৎসম প্রতিশব্দ—’বিপণন’। সংস্কৃত ‘বি’ উপসর্গ আর ক্রয়-বিক্রয়বাচক ‘পণ’ ধাতুর রসায়নে তৈরি এই ‘বিপণন’ শব্দটির সৌন্দর্য অতুলনীয়। যেখানে সংকীর্ণ ‘বিক্রয়’ কেবল পণ্য হস্তান্তরের হিসাব কষে, সেখানে বিপণন একটি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া । শুরুতে বিপণী বিতানের সাথে যুক্ত করে ‘বিপণন’ শব্দটিকেও সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হতো । ইদানিংকালে ‘বিপণন’ শব্দটি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয় । ‘বিপণন’ এখন এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া— যা পণ্য তৈরির আগের বাজার গবেষণা থেকে শুরু করে ভোক্তার ঠোঁটের কোণের সন্তুষ্টির হাসিটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত। যে শোরুম বা দোকানে এই যজ্ঞ চলে, তার নাম ‘বিপণি’ আর যিনি এই রূপকার, তিনি ‘বিপণনকারী’। মার্কেটিং এর যথাযথ বাংলা “বাজারজাতকরণ” হলেও এই শব্দটি একাডেমিক জগতে যতটা জনপ্রিয় হয়েছে, বাজারে কিন্তু এই শব্দটা (ওজনে ভারী মনে হওয়ার কারণে) ততটা জনপ্রিয় হয়নি । বাজারজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকেরাও ‘মার্কেটিং’ শব্দটিকেই বেশি ব্যবহার করে। আমি নিজে “বাজারজাতকরণ” শিরোনাম ভিত্তিক প্রায় ডজন খানেক বই লিখেও শব্দটিকে ‘মার্কেটিং’ এর জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে পারিনি । আজ প্রাতিষ্ঠানিক দলিলে, বই পুস্তকে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ‘বিপণন বিভাগ’/’ বাজারজাতকরণ বিভাগ’ তার গাম্ভীর্য বজায় রাখলেও, আমাদের লেনদেনভিত্তিক বাণিজ্যিক জগতে ‘মার্কেটিং’ শব্দটাই রাজত্ব করে। লাতিনের ‘মের্কা-তুস’, ফরাসির ‘মার্শে’, জার্মানের ‘মার্ক্ট’, স্প্যানিশের ‘মের্কাদো’, আরবের ‘সুক’ ও ‘তাসউইক’, চীনের ‘শি-ছাং’ ও ‘ইং-শিয়াও’ আর বাংলার ‘বিপণন’,’বাজারজাতকরণ’ তথা ‘মার্কেটিং’—সবাই যেন একই সুতোয় গাঁথা, সভ্যতার আদিম ও অকৃত্রিম এক বিনিময়ের বিশ্বজনীন কাব্য। বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার অর্থনীতি, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার এবং বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্কৃতির কারণে এই শব্দ দুটির সমার্থক বা অনুবাদিত শব্দ ব্যবহার না করে সরাসরি ইংরেজি শব্দ দুটিকেই অধিকাংশ ভাষা নিজের করে নিয়েছে । ইংরেজি ধারার ‘মার্কেট’ ও ‘মার্কেটিং’ শব্দ দুটি বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর অনেক ভাষায় সরাসরি ঋণশব্দ(Loanword ) বা নিজস্ব শব্দ হিসেবে ব্যাপক গৃহীত এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমনটি ঘটেছে ‘বাজার’ শব্দটির ক্ষেত্রে । ভাষাগুলোর নিজস্ব ব্যাকরণ ও অভিধানে এই শব্দগুলো স্থান স্থায়ী । বাংলার বাইরেও যে সকল ভাষা এই শব্দগুলোকে আপন করে নিয়েছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, তুর্কি, ডাচ, রুশ, বাহাসা ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়ান, জাপানি, হিন্দি ও উর্দু।