” বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী করতে হবে ” –অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-

হাকিকুল ইসলাম খোকন, আমেরিকা : বাপেক্সের রিগ সংগ্রহ এবং কূপ খননের ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১৯৭৭-১৯৮১ সময়কালে আজকের ‘বাপেক্স’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না।

তখন অনুসন্ধান কাজ চলত পেট্রোবাংলার অধীনে ‘এক্সপ্লোরেশন ডিরেক্টরেট’ বা অনুসন্ধান পরিদপ্তরের মাধ্যমে। তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ৫টি গ্যাসক্ষেত্র (তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ও বাখরাবাদ) রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসার পর দেশীয় সক্ষমতা তৈরির একটি ভিত্তি রচিত হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই (এরশাদের আমলে) পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান উইংকে বিলুপ্ত করে একটি স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে বাপেক্স (BAPEX) প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে নতুন কোম্পানি হিসেবে শুরুর দিকে এর বাজেট, প্রযুক্তি ও রিগের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত ছিল।

১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ এই দুই মেয়াদে বাপেক্সের নিজস্ব কারিগরি কার্যকলাপে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯৬ সালের পর থেকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে বাপেক্স নিজস্ব উদ্যোগে মাত্র ১টি অনুসন্ধান কূপ খনন করতে পেরেছিল। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (IOC) ওপর নির্ভরশীলতা বেশি ছিল। তবে এই আমলেই ২০০০ সালে বাপেক্সকে শুধু অনুসন্ধানকারী সংস্থা থেকে “গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানি” হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় এবং প্রথম নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র (সালদা নদী) পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০৯-২০২৪ সময় কালে রিগ ও কূপ খননে বড় উল্লম্ফন ঘটে । রিগ সংগ্রহ এবং কূপ খনন—উভয় দিক থেকেই এ আমলে সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক বাপেক্সের বহরে নিজস্ব কাজের উপযোগী রিগ ছিল মাত্র ৩টি। ২০০৯-২০২৪ সময়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করে বাপেক্সের জন্য ৪টি নতুন আধুনিক রিগ (যার মধ্যে সর্বাধুনিক ১৫০০ হর্সপাওয়ারের ‘বিজয়-১২’ অন্যতম) কেনা হয়। ফলে বাপেক্সের নিজস্ব সচল রিগের সংখ্যা ৫টিতে উন্নীত হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার করা হয়। এই সময়ে সরকারের বিশেষ আইনের অধীনে বাপেক্স নিজস্ব উদ্যোগে এবং রাশিয়ান কোম্পানি গাজপ্রমকে (Gazprom) সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৩০টিরও বেশি নতুন কূপ খনন এবং অসংখ্য ওয়ার্কওভারের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করে। এই আমলেই শ্রীকাইল, সুন্দলপুর, রূপগঞ্জ, ভোলা উত্তর এবং জকিগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। তবে আর্থিক ও জনবল সংকটের কারণে বাপেক্সকে “পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর” করা যায়নি। স্থলভাগে ব্যাপক অনুসন্ধান ও খনন কাজ চললেও বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসীমায় (Offshore) গ্যাস অনুসন্ধানে দৃশ্যমান কোনো বড় সাফল্য বা জোরালো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান দ্রুত বাড়াতে সর্বমোট ১৫০টি কূপ খনন ও মেরামতের একটি মেগা রোডম্যাপ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২০২৮ সালের মধ্যে স্থলভাগেই ১০০টি কূপ খননের লক্ষ্য রয়েছে। এই বিশাল পরিকল্পনায় বাপেক্স একাই তার নিজস্ব রিগ ও দেশীয় জনবল ব্যবহার করে ৬৯টি নতুন কূপ খনন এবং ৩১টি কূপে ওয়ার্কওভারের একক দায়িত্ব পেয়েছে। ইতোমধ্যে বেগমগঞ্জ-৪, শ্রীকাইল-৫ এবং জামালপুর-১ কূপে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় রেকর্ড গতিতে কাজ চলছে। অধিক গভীরতায় কূপ খনন ক্ষমতা সম্পন্ন রিগ দিয়ে বাপেক্স এবার পাবনার মোবারকপুর এবং কুমিল্লার শ্রীকাইলে মাটির নিচে প্রায় ৬,০০০ মিটার গভীরে উচ্চ প্রযুক্তির গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু করেছে, যা আগে কখনো করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান জ্বালানি সংকটের যুগে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছেছিল , তা সফল করতে বাপেক্সকে শতভাগ স্বাবলম্বী ও গতিশীল করার কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *