বেনাপোল প্রতিনিধিঃ দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ডিজিটাল ওজনস্কেলে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস এবং পণ্য আত্মসাতের একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। শুল্ক ফাঁকির এই সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। ফলে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে রেকর্ড ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
কাস্টমসের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯.৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা।
একই সাথে কমেছে পণ্য আমদানির পরিমাণও। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ২Sহাজার ১৪৪ মেট্রিক টনে। এনবিআরের হিসাব বলছে, বিশেষ করে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য যেমন—ফল, শাড়ি ও থ্রি-পিসের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাফটা (SAFTA) সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন বছরে ৭ শতাংশ ও ১১ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই শুল্ক বৃদ্ধির পর থেকেই একটি অসাধু চক্র কম শুল্কে পণ্য খালাসের জন্য নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এছাড়া, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে সমমানের সাফটা সুবিধা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কাস্টমসের একটি চিঠি ফাঁসের পর ওজনস্কেলের কারচুপির বিষয়টি সামনে আসে। সহকারী কাস্টমস কমিশনার অতুল গোস্বামী স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেখা যায়, গত ১৪ জুন বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল স্কেলে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের (নম্বর: HR-38-AK-4018) একই সময়ে দুটি ভিন্ন ওজনের স্লিপ তৈরি করা হয়। একটি স্লিপে ট্রাকের ওজন ৪,৮৮০ কেজি এবং অন্যটিতে ৪,৯২০ কেজি দেখানো হয়। এই ঘটনার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক পরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে।
এর আগে ২৫ এপ্রিল একটি আঙুরবোঝাই ভারতীয় ট্রাকের খালি ওজন ১৩,৩১০ কেজির স্থলে ১৩,৮৮০ কেজি দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। তৎকালীন ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি একে “কারিগরি ত্রুটি” বলে দাবি করলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এটি নিয়মতান্ত্রিক জালিয়াতি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল শেড এবং অন্যান্য শেডগুলোকে শুল্ক ফাঁকির নিরাপদ আস্তানা বানানো হয়েছে। পণ্য এনে শেডের বিভিন্ন কোণায় লুকিয়ে রাখা হয় এবং সুযোগ বুঝে ধীরে ধীরে পাচার করা হয়।
১২ মার্চ: ৩৭ নম্বর শেড থেকে ‘বেকিং পাউডার’ ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস গায়েব করা হয়। তদন্ত শেষে ১০ জুন ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
২৬ জুন: ২৬ নম্বর শেডে ‘পেনসিল ও ইরেজার’ ঘোষণার আড়ালে আনা ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করা হয়।
২৭ জুন: কেমিক্যাল জোন থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের সময় হাতেনাতে ধরে মামলা করা হয়।
জুন মাসেই শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য চুরির অভিযোগে ৪টি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং কাস্টমস সিপাই মোহাম্মদ সাগরসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে এই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান। তিনি বলেন,যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেখানে শেড ইনচার্জদের কেন বাদ দেওয়া হলো? শেডের ভেতর থেকে পণ্য কীভাবে গায়েব হলো, তার দায় তাদের নিতে হবে। মূল অপরাধীদের আড়াল করলে প্রকৃত সত্য কখনোই বের হবে না।”
সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বন্দরের স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি পুরো ওজন প্রক্রিয়াকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আনার তাগিদ দে
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন জানান, ওজনস্কেলের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন,
”সরকারের এক টাকার রাজস্বও যেন ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক। কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা আমদানিকারক—যারাই জড়িত থাকুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। রাজস্ব সুরক্ষায় গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।”