৪র্থ পর্ব- অতল জলে জলাঞ্জলি

“অতল জলে জলাঞ্জলী “

পর্ব-৪

উপন্যাসিকঃ এ কে সরকার শাওন

পদ্মারপাড়ে প্রথম দিন

শরতের শেষে সেদিন প্রথম পদ্মারপাড়ে গিয়েছিলো জগলু। ছুটির দিন থাকায় মনে হয় তুলনামূলক ভীড়টা একটু বেশী। একটি নির্জন স্থানে গিয়ে একটি দৈনিক কাগজ বিছিয়ে আরাম করে বসলো। বাবা বলতেন, “যে কোন পরিবেশে সর্বোচ্চ ভালো থাকার চেষ্টা করবে”! কতো বিশাল এই পদ্মা নদী। শুধু নামই শুনে আসছে। আজ স্বচক্ষে দেখে নয়নযুগল স্বার্থক করলো। এখানে আগেই আসা উচিত ছিলো। তবে পদ্মার জল মেঘনার মত টলমলে স্বচ্ছ নয় । মেঘনার জল দেখলেই স্নানের সাধ জাগে।

একটি অখণ্ড নীল আকাশে শিমুল তুলোর মত কোদালে মেঘের ভেলাদল দ্রুত ভাসছে। এপারে কালচে শ্যামল নদীর তীরে সাদা কাশবন। দূর আকাশে ধবধবে সাদা উড়ন্ত বকের ঝাঁকের আলপনা। কিঞ্চিৎ হিমেল হাওয়ায় দোলায়িত কাশ ফুলদল দূর থেকে দেখে মন হারিয়ে যায় নিমিষেই। কাশফুলে ছেয়ে যাওয়া দিগন্ত রেখায় শুভ্র বালুচরের সাথে নুইয়ে পড়া আকাশ এসে মিশে গেছে মিতালী পাতাতে।

জগলু ভাবলো কবিতা লিখার জন্য যথোপযুক্ত স্থান এবং সময়। কবিতার খাতাটা না এনে বড্ড বোকামী করেছে। কলম তার কাছে আছে কিন্তু কাগজ নেই। তবে ইচ্ছে থাকলে একটা না একটা উপায় বের হয়ই।
বাদাম, চীনাবাদাম বলে কিশোর বাদামওয়ালা যাচ্ছিলো।
জগলু দেখলো ওর বাদামের উপর একটি বই। এই বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ঠোঙ্গা বানিয়ে সে বাদাম বিক্রি করে।
জগলুঃ এই খোকা, আমাকে দু’টাকার বাদাম দাও। আর তোমার এই বইটা দেখি?
বাদামওয়ালা বইটি দিলে জগলু পৃষ্ঠা উল্টিয়ে একটি খালি পৃষ্ঠা বের করে ছিড়ে নিলো।
বাদামওয়ালাঃ কি করবেন এই পাতা দিয়া?
জগলুঃ কবিতা লিখবো।
বাদামওয়ালাঃ ওহ, আপনে কবি?
জগলুঃ ক্ষুদ্র কবি বলতে পারো। তুমি কবিতা পছন্দ করো?
বাদামওয়ালাঃ একটু একটু, বেশী বুঝি না তো! আমি ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছি…
জগলুঃ তারপর পড়লে না কেন?
বাদামওয়ালাঃ মায় মইরা যাওনের পর বাপে আবার বিয়া করছে। সৎ মা বইটই চুলায় জ্বালাই দিছে।
জগলুঃ তোমার বাবা কিছু বলে নি?
বাদামওয়ালাঃ হেয় আর কি কইবো? মা মরলে বাপ তালৈ! এমন বাপ থাকা আর না থাকা একই কথা।

জগলুর বুকটা হাহাকার করে উঠলো তার বাবার জন্য। তার বাবা তার সুখের জন্য পুরো জীবনইটাই জলাঞ্জলি দিয়ে গেলো। জগলু কী পারবে তার বাবার মুখে হাসি ফোঁটাতে!
বাদামওয়ালাঃ এই নেন বাদাম।
জগলু বাদাম নিয়ে দু’টো টাকা দিতে গেলে সে না নিয়ে
বললো
-আপনে কবি তাই দাম নিবো না!
জগলু আশ্চর্য হয়ে গেলো। বললো
-তুমি একটা কবিতা শোনাতে পারবে?
-হুম পারমু, তয় চার চরণ

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’ – এই যার পণ৷

জগলুঃ সাবাশ! কে শিখিয়েছে এই কবিতা?
বাদামওয়ালাঃ আমার মা!
জগলুঃ তোমার মা যা শিখিয়ে গেছে এটাই একটা লোক মানুষ হবার জন্য যথেষ্ট। তথাকথিত শিক্ষিত না হলেও মানব শিশু মানুষ হয়। এই নাও এই টাকাটা রাখ।
জগলু জোর করে দশটি টাকা ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। বাদামওয়ালা চলে গেলে জগলু ভাবলো এখনকার বঙ্গ সন্তানদের বাচালতা দেখলে কবি কুসুমকুমারী দাশও অজ্ঞান হতেন।
জগলু মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলে কবিতা লিখায় মন বসালো…

কবিতার শেষের অংশে ইচ্ছে করেই দিঘী ব্যবহার করেছে। যেন সে গ্রামের শেফালী দিঘীর পাড়েই বসে আছে। তাছাড়া পদ্মার ঘোলা জলে মানুষের ছায়া দেখা যায় না। তবে মেঘনায় যায়।

সে দূরে তাকিয়ে দেখলো কবীর ও জিল্লুর দাঁড়িয়ে কোমল পানীয় পান করছে। দু’জনার গায়ে জাফর ইকবাল শৈলীতে হাতাকাটা হলুদ গেঞ্জি। জগলু ওদের দু’জনার নাম ধরে ডাকলে ওরা কাছে এসে বসলো।
কবীরঃ বিকেল ঘুম থেকে উঠে দেখি তুই বিছানায় নাই। আমি ভেবে পেলাম না তুই কোথায় গেলি!
জগলুঃ জিল্লুরকে পেলি কোথায়?
জিল্লুরঃ ও দাঁড়িয়ে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে। আমি আমার ফুফার সাথে বুলনপুরে যাচ্ছিলাম। ওকে দেখে ওকে তুলে নিলাম। ও বললো পদ্মারপাড়ে নামবে। তাই আমিও নেমে পড়লাম।
জগলুঃ বেশ করেছিস
কবিতার কাগজটা ভাজ করে বুক পকেটে রাখবে এমন সময়
জিল্লুরঃ তোর হাতে ওটা কি?
জগলুঃ কিছু না,
জিল্লুরঃ প্রেম পত্র না তো?
জগলুঃ আরে না!
কবীরঃ তাহলে দেখাচ্ছিস না কেন?
জগলুঃ এই নে
জিল্লুরঃ এ তো দেখছি কবিতা! কবীর, তুই আবৃত্তি করে শোনা!
কবীরঃ কাগজটি জিল্লুরের হাত থেকে কবিতাটি নিয়ে আবৃত্তি করতে লাগলো।

অসীম নীলে মাতাল অনিলে
মেঘের তুলো ভাসে!
সবুজ দিগন্ত বন বনান্ত
প্রান খুলে হাসে!

সাদা নীলে দারুণ মিলে
দূর আকাশের গায়!
নীলে সবুজে দারুণ সাজে
দিকচক্রবাল রেখায়!

রংয়ের ছোঁয়ায় মন হারায়
অনিন্দ্য সুন্দর ধরা!
ছন্দ সুরে প্রাণ ভরে
আলোয় ভূবন ভরা!

কলা পাতা দোলায় মাথা
ভাসবে মেঘের সনে;
বাউলের চুল উড়ুক্কু কুন্তল
উড়বে দূর গগনে!

শরৎ আকাশ রম্য ক্যানভাস
স্বচ্ছ রহস্যময় নির্মল;
মেঘের পরে মেঘ উড়ছে
জগলুর চিত্ত বিহ্ববল!

শরীর ছেড়ে মন উড়
বিনি সুতার ডোরে;
উল্লাসে দূরে চিলেরা উড়ে
গোধূলির লাল আবীরে!

স্বচ্ছ টলটলে দিঘীর জলে
আকাশের মোহনীয় ছায়া!
সাঁঝের বেলা জগলু একেলা
জলতলে হারায় কায়া!

কবীরঃ চমৎকার! শালা, তুই দেখছি কবি!
জগলুঃ এই একটু আধটু
জিল্লুরঃ এবার পুরো কবি হবি। তোর লেখার হাত পাকা। কবীর কবিতাটি দে। রাজশাহীর দৈনিক বার্তার সাহিত্যের পাতা দেখে আমার এক বড় ভাই। আজই তার হাতে দিয়ে আসবো। আমি আশাবাদী সে তোর কবিতাটি প্রকাশ করবে।
জগলুঃ তোকে ধন্যবাদ বন্ধু।
জিল্লুরঃ হয়েছে হয়েছে ওঠ
কবীরঃ হুম বলে উঠতেই পা লেগে মাটিতে রাখা বাদামের পোটলা থেকে সব বাদাম পড়ে গেলো।
হায়রে কখন বাদাম কিনেছিস! একটাও মুখে দিস নি।
সকলে মিলে বাদাম কুড়ায়ে পদ্মারপাড় ত্যাগ করলো।

এভাবেই কাটতে লাগল জগলুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। ইদানীং বন্ধু বেড়েছে। খরচও বেড়েছে। গাঁয়ের কথা ভাবা কমেছে। গৃহশিক্ষকতার পরিধি ও বাড়িয়েছে। কবিতার ও গৃহশিক্ষকতার সুনামও ছড়াচ্ছে। গত বৎসর বাড়ীতে গিয়ে সে বাবাকে বলেছে বাবা, আমি গৃহশিক্ষকতা করে যা পাই তাতে আমার চলে যায়। তুমি আমাকে আর কোন টাকা পাঠিয়ো না। বাবা শুধু বলেছিলো, দেখিস লেখাপড়ার যেন কোন ক্ষতি না হয়। জগলু বলেছিলো তুমি আমার জন্য কোন চিন্তা করো না। তবে এখন সে বছরে দু’বারের বেশী বাড়ী যাবার সময় পায় না। জীবন যেখানে যেমন জগলু সেখানে তেমন।

৩য় পর্ব-https://kalersongbad.com/সারা-খবর/৩য়-পর্ব-অতল-জলে-জলাঞ্জলি/

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *