সাদী মোহাম্মদ টেক্সস আমেরিকাঃ বছরের পাঁচ আগস্টে যখন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় তখন একজন আওয়ামী লীগার হিসেবে স্বভাবতই সেটা আমার ভালো লাগে নাই। শেখ হাসিনার ওভাবে করে পতন হবে তা কখনোই প্রত্যাশা করি নাই। দেশে আন্দোলন যখন তুঙ্গে আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছিলাম যে এযাত্রায় শেখ হাসিনা বুঝি টিকে থাকতে পারবেন না। একজন আওয়ামী লীগার হিসেবে তাই মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম যে একটা সমঝোতার মাধ্যমে সম্মানের সহিত শেখ হাসিনার পদত্যাগ গৃহিত হোক। কিম্বা শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেও তা যেন বল প্রয়োগের মাধ্যমে না হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে হয়। আর এজন্যেই প্রবাসে বসে অনেক দূর থেকেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচনার জন্য বিভিন্ন ভাবে তাগিদ দিচ্ছিলাম। কিন্তু সেটা আর হয় নি। শেষ পর্যন্ত প্রবল আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। কথিত আছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যেতে চান নাই। কিন্তু সেনাবাহিনী তাকে জোড় করে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তবে যেভাবে যেকরেই কিম্বা যার কারণেই শেখ হাসিনা ভারতে যান না কেন আজ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় নাই এটাই বাস্তবতা এটাই সত্য।
শুরুতে যখন কোটা বিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয় তখনই বলেছিলাম একটা সমাধান কৃত বিষয় নিয়ে জল ঘোলা করার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য বা দুরভিসন্ধি আছে নিশ্চই। পরবর্তীতে কোটা আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল সেটা আমরা সকলেই দেখতে পেরেছি। শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নিলেও আন্দোলন কিন্তু থামে নি আর। যদিও সেক্ষেত্রে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। শুরুতে কোটা আন্দোলনকে তেমন একটা গুরত্ব দেয়া হয় নাই সরকারের পক্ষ থেকে। আর গুরত্ব না দেয়ার কারণে যা হবার তাই হয়েছে। ৫ আগস্টে এসে শেখ হাসিনা সবকিছু ছেড়েছুড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষমতার মসনদ বালুর বাঁধের মতো এক নিমিশে ধ্বসে পড়েছে। এসবই এক বছর আগের ঘটনা।
আন্দোলনের প্রথম দিকে ১৬ জুলাই রংপুরে যখন আবু সাঈদ মারা যায় তখন আবু সাঈদকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছি। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি ছেলেটির মৃত্যুতে। যদিও পরবর্তী সময়ে আবু সাঈদের মৃত্যু নিয়ে নানা রকম কথা উঠেছে। কারণ আবু সাঈদের দিকে পুলিশ সরাসরি মরণ ঘাতি গুলি নয় দূর থেকে রাবার বুলেট ছুড়েছিল মাত্র। কিন্তু আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল তথাকথিত কোটা বিরোধী আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। তথাকথিত কোটা বিরোধী আন্দোলন বলছি এই জন্য যে জুলাই আগস্টের আন্দোলনটা আসলে কোটা বিরোধী আন্দোলন ছিল না। আন্দোলনটা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলন। যেটা পরবর্তীতে ৫ আগস্টে হয়েছেও। তবে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে আমি ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ভাবে মেনে নিয়েছিলাম। মেনে নেয়াটাই ছিল বাস্তবতা। সবকিছু মেনে নিয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তীতে একটা সুখী সমৃদ্ধ স্থিতিশীল ভালো বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিলাম মনে প্রাণে। মনে মনে চেয়েছিলাম শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থকেলেও বাংলাদেশটা ভালো থাক। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।
ডঃ ইউনূসের নের্তৃত্বে ৮ আগস্টে অর্ন্তবর্তী কালীন সরকার ক্ষমতা নিলে শুরুতেই আরও অনেকের মতো করে আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলিনি কিন্তু। চুপ থেকেছি। অবজার্ভ করেছি। আওয়ামী লীগের পতনকে আওয়ামী লীগের ভুলের কারণেই হয়েছে বলে মন্তব্য করেছি।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই ইউনূস সাহেব যখন রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে দেশ ও দেশের অতিতের সমস্ত কিছু, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের সমস্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য মুছে দিতে উদ্যোত হলেন তখন আর চুপ করে থাকতে পারি নাই। পরবর্তীতে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারের বাড়ি গুড়িয়ে দেয়া। যখন সরকারের নিজস্ব মদদে আওয়ামী লীগ নিধনের নামে সারা দেশে একের পর এক হত্যা রাহাজানি জ্বালাও পুড়াও লুটপাট সন্ত্রাস চাঁদাবাজি শুরু হলো যেটা এখনো কম বেশি চলমান তখন আর চুপ থাকতে পারি নি। এরকম পরিস্থিতিতে চুপ থাকা যায় না। তাই বর্তমান ইউনূস সরকারের নানা রকম বিতর্কিত কর্মকান্ড নিয়ে লিখে চলেছি অবিরত।
আজকের লেখাটিও ঠিক তেমনই একটা লেখা।
৫ আগস্ট অনেকের কাছে অনেক কিছু হলেও আমার কাছে এটা তথাকথিত ৫ আগস্ট ছাড়া আর কিছুই না। এটা বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শুধু পতন ছাড়া অন্য কিছু্ও না। ৫ আগস্ট নিয়ে অনেকে অনেক বড় বড় বুলি আওরালেও শুরুতে যে উদ্দেশ্য যে ভালো ভালো কথা বলা হয়েছিল বিগত এক বছরে সেসবের তেমন কিছুই বাংলাদেশে হয় নাই। এখন আবার অনেকেই বলতে শুরু করেছেন যে শেখ হাসিনাই ভালো ছিল। শেখ হাসিনা মন্দ হলেও তিনি মন্দের ভালো ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসন আমল বর্তমানের চেয়ে ভালো ছিল। তখন মুষ্টিমেয় কিছু লোকের সমস্যা বা অসুবিধা হলেও দেশের অধিকাংশ লোক ভালো ছিল নিরাপদে ছিল। দেশে স্থিতিশীলতা ছিল। হ্যা সেসময় হয়তো বা দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না। কিন্তু এখন যা আছে যা চলছে সেটাকে কি গণতন্ত্র বলে ? নিশ্চই না। এখন দেশে যা হচ্ছে চলছে সেটা গণতন্ত্রের নামে মবতন্ত্র। দেশের কোথাও কোন শান্তি নাই। সস্তি নাই। মবতন্ত্রের নামে যে যা খুশি তাই করছে। চলছে সীমাহীন চাঁদাবাজি লুটপাট আর ধর্ষণের মহা উৎসবও ! গণতন্ত্রে উত্তোরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ পড়েছে এক ভয়াবহ কুতন্ত্রে। আজ চারিদিকে সবকিছুতেই শুধু অনিশ্চয়তা। কখন যে কে কী করছে কে কী বলছে তা কেউই জানে না।
জানি আমার লেখা পড়ে অনেকেই বলবেন আমি একজন আওয়ামী লীগার বলেই এসব লিখছি। না তা কোন ভাবেই না। শেখ হাসিনার পতনের পর বিগত এক বছরে দেশে যদি সত্যিই ভালো কিছু হত তাহলে আজ আর এই লেখা লিখতাম না। কারণ আমি একজন আওয়ামী লীগার হলেও দল কানা আওয়ামী লীগার নই কখনোই। আচ্ছা সংস্কার সংস্কার করে চিল্লানো ছাড়া দেশে এই এক বছরে ভালো কী কী হয়েছে তা কি কেউ বলতে পারবেন ? আপনার বা আপনাদের দেখা বা পরখ করা গত এক বছরে বাংলাদেশে ভালো কাজের লিস্টগুলো কমেন্টে দিতে পারেন ইচ্ছে হলে। কিম্বা আমার এই লেখার বিপরীতে আপনি বা আপনারা লিখতে পারেন। তাহলে আমি বা আমরা আপনার বা আপনাদেরটাও জানতে পারতাম। ৫ আগস্টের আন্দোলনের পর বাংলাদেশে কী কী ভালো কাজ হয়েছে তা অবগত হতাম। তবে আপনারা চাইলে আমি আমার এই লেখার বাইরেও গত এক বছরের বাংলাদেশের অসংখ্য খারাপ কাজের লিস্ট এক দুই তিন ক্রমিক নাম্বার দিয়ে লিখে আপনাদেরকে দিতে পারি। এই যে অসংখ্য খারাপ কাজ ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে হয়েছে বা হচ্ছে আমরা তা কোন ভাবেই প্রত্যাশা করি নাই। আর আপনারাও (যারা তথাকথিত কোটা আন্দোলন বা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন এবং সবশেষে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন) কোন খারাপ কাজ নয় অসংখ্য ভালো কাজেরই প্রত্যাশা দিয়েছিলেন আমাদেরকে। কিন্তু ভালো কাজ তো দূরে থাক মবতন্ত্রের নামে সীমাহীন সন্ত্রাস চাঁদাবাজি স্বজনপ্রীতি দুর্নীতি রাহাজানি খুন ধর্ষণ ছাড়া আপনারা বিগত এক বছরে বাংলাদেশের জনগণকে কিছুই দিতে পারেন নাই। যা দেশের প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছে আর বলছে এই বাংলাদেশ আমরা চাই নাই।
সবশেষে শুরু করেছেন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তালবাহানা। আরে ভাই আওয়ামী লীগকে তো নিষিদ্ধ ঘোষণাই করেছেন তারপরেও কেন নির্বাচন দেয়া নিয়ে আপনাদের এত ভয় ? মনে রাখবেন বিগত এক বছরে আপনারা দেশে যা করেছেন, মানুষ যে ভাবে আশাহত হয়েছে তাতে করে নির্বাচন একশো বছর পরে হলেও আপনাদের দ্বারা ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। ছাগল দিয়ে যে হালচাষ হয় না সেটা বাংলাদেশের জনগণ বর্তমানে খুব ভালো ভাবে উপলদ্ধি করছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা ভালো নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভালোয় ভালোয় বিদায় নেন আপনারা। বাংলাদেশটাকে বাঁচতে দেন। আর এই ক্ষমতা পরবর্তী সময়ে আপনাদের অবস্থা কী হতে পারে কেমন হতে পারে সেটা ভেবে তার আগাম প্রস্তুতিটাও নিয়ে রাখবেন দয়াকরে। আজ লিখে দিলাম যেদিন থেকে আগে পিছে আর পুলিশ কিম্বা সেনাবাহিনী থাকবে না সেদিন কিন্তু একটারও পাছার ছাল থাকবে না। বিশেষ করে কোটি কোটি মানুষের আবেগ অনুভূতি আর আদর্শিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হেয় করা অবমাননা করা আর বাংলাদেশের রাজনীতির সুতিকাগার বলে পরিচিত ঐতিহাসিক ৩২ নাম্বার ভাঙ্গার প্রতিশোধ বাংলার জনগণ নেবেই নেবে। ৩২ নাম্বারের সামনে কে বা কারা লুঙ্গি ডান্স দিয়েছে। কারা গরু জবাই দিয়ে জিয়াফত খেয়েছে বাংলার জনগণ তা ভালো ভাবেই মনে রেখেছে।
আর হ্যা ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে যখন কারও সঙ্গে আমার কথা হত তখন বলতাম, এই ছেলে গুলোর উদ্দেশ্য যদি সৎ বা ভালো হয়ে থাকে। যদি কারও দ্বারা প্ররোচিত বা অর্থ ক্ষমতার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তারা দেশের জন্য দেশের জনগণের জন্য আন্দোলনটা করে থাকে তাহলে আগামীতে বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছুই অপেক্ষা করছে। আর যদি উদ্দেশ্য সৎ না হয় যদি নিজেদের স্বার্থে অর্থ বিত্ত আর প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য তারা এসব করে থাকে তাহলে বাংলাদেশটার কপালে অসীস দুঃখ আছে। বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে অতল তলে। এখন আপনাদের কাছে প্রশ্ন রইলো এই এক বছরে আপনারা যা যা দেখলেন তাতে করে কি এই ছেলে গুলোর উদ্দেশ্য সৎ ছিল সেদিন ? প্রশ্নটির উত্তর দিবেন দয়া করে।
আর ইউনূস সাহেবের ব্যাপারে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতাম, ব্যাচারা শেষ বয়সে এসে শুধু একটা কথাই বলবেন যে, এই জীবনে একটাই বড় ভুল করেছিলাম আর তা হলো বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালিন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলাম। ইউনূস সাহেবের এই কথাটি বলারও কত সময় বাকি সেটাও বলবেন আপনারা দয়া করে।
সবশেষে প্রত্যাশা করবো দেশী বিদেশী সকল ষড়যন্ত্রকে রুখে দিঢে সন্ত্রাস নৈরাজ্য অরাজকতা আর মবতন্ত্রকে প্রতিহত করে বাংলাদেশটা সামনের দিকে এগিয়ে যাক। আমার প্রিয় বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাক। ভালো থাক ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য মা বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া হাজার বছরের শেষ্ঠ বাঙালী বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের।